পর্ব-০৮

ভোর পাঁচটা। মেঘলা আকাশ থেমে থেমে কাঁদছে। রাতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছিলো। এখন বৃষ্টির তোপ একটু কম। মংডু মিডল টাউনের সান হাউজ হতে বের হয়ে আসছে ফোর হুইলের একটি সাদা পাজেরো। ড্রাইভিং সিটে পিদাও সান। পিছনে পাশাপাশি বসেছে মেয়াও চু এবং সোয়ে সোয়ে সান। পিদাও সান মংডুর পরিচিত মুখ হওয়ায় সিমান সান তাকে ড্রাইভিং করে নিয়ে যেতে বলেছিলেন।


সোয়ে সানের ড্রেসআপ আজকে কিছুটা ব্যতিক্রম। উপরে সাদা গাউন সরু কোমরের নিচে নেমে এসেছে। নিচে ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ থামি। মোটা কাপড়ের উড়না গলার দুই পাশ হতে এসে বুক আবৃত করেছে। পায়ে মাঝারী উচ্চতার হিল। চোখের কাজল গভীর কালো নয়নকে আরো গভীর করে তোলেছে। ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিকের ছোঁয়া লাল গোলাপী ঠোঁট জোড়াকে অপরূপ সাজে সজ্জিত করেছে।
বাড়ি হতে বের হওয়ার সময় মেয়াও জিজ্ঞেস করেছিলো,-
” সোয়ে সান! আমি কী ড্রেস পরবো?”
: “মিনি স্কার্ট আর থামি পরো!” আবর্তিত তৃণলতার মতো শরীর বাঁকিয়ে হাসির ফোয়ারা ছুটছে সোয়ে সানের পুরো চেহারায়। বাঁকানো শরীরের মাংসল ভাঁজে ভাঁজে যেন আন্দামানের ঢেউ খেলে গেলো। একরাশ মুগ্ধতা সহকারে বিষ্ময় নিয়ে আরকানি ফুল দেখছে মেয়াও সান।
: “এই! এভাবে কী দেখছো? ড্রেস আমারটা পড়ার শখ হলো নাকি?” আবারো জোকসের সুরে সোয়ে সান।
: “না। মানে। ঐ যে।”
: “কী?” চোখ টিপে সোয়ে সান।
: “মানে এখনি তোমারগুলো খোলে দাও। আমি পরে নিচ্ছি!” দুষ্টুমির হাসি খেলে গেলো মেয়াও চু’র ঠোঁটের কোণে।
: “ড্রেস আমারটা এখনই খুলছি না জনাব। শার্টের উপরে লুঙ্গি ইন করে পড়তে পারেন। আমার সুপারম্যানকে সর্বদা সুপারম্যান হিসেবে দেখতে চাই।” কপট রাগ দেখিয়ে সোয়ে সান।
: “লুঙ্গির উপরে শার্ট ইন করলেই সুপারম্যান হওয়া যায় না ডার্লিং। সুপারম্যান হতে হলে সুপার কিছু করে দেখাতে হয়!”
: “আচ্ছা আচ্ছা। ভোর হতে চলেছে। দ্রুত রেডি হও। তোমার যা ইচ্ছে তাই পরো। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”


মেয়াও চু রেডি হয়ে আসার সাথে সাথেই গাড়িতে চড়ে বসেছে। সানদের বাড়ি হতে ছয়শো গজ লাল ইট বিছানো ব্যক্তিগত রাস্তা মিশেছে মংডু-ইয়াঙ্গুন হাইওয়ে রোডে। মেয়াওদের গাড়ি প্রধান সড়কে ওঠে ইয়াঙ্গুনমুখি রাস্তাকে ডানে রেখে বামে টার্ন নিলো। তিন মিনিট চলার পর শহরের ওয়াই পয়েন্ট। ইংরেজি ওয়াই বর্ণের মতো একটি মাথা পার্বত্যাঞ্চল দিয়ে বুথিডং হয়ে রাথিডং এর দিকে চলে গেছে। যে দিক হতে মেয়াওরা আসছিলো সেটি ইয়াঙ্গুন হয়ে রাজধানী নাইপিদাও এর দিকে চলে গেছে। সামনে বাম দিকের রাস্তাটি ওয়াই এর নিচের অংশের মতো একটা বাঁক নিয়ে বাংলাদেশের ঘুমধুম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত, যেটি আঞ্চলিক বিশ্বরোড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমান্তের ঐ পাড়ে বাংলাদেশ পরিকল্পিত আঞ্চলিক বিশ্বরোডের কাজ শুরু করেছে। রাস্তাটি মায়ানমার হয়ে চায়না পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। মূলত মহাসড়কের উভয় পাশ এবং পরিকল্পিত বৃহত্তম সমুদ্র বন্দরের কাছাকাছি কোন রোহিঙ্গা বসতি চায় না মায়ানমার। মহাসড়কের ওয়াই পয়েন্টের ডান পাশে একটি পুরাতন মসজিদ। ফজরের নামাজের উদ্দেশ্যে কিছু মুসল্লি মসজিদে যাচ্ছে। মংডু-রাথিডং-বুথিডং রোডে মসজিদের মাত্র একশো মিটার সামনে একটি পুরানো প্যাগোডা। রাথিডং-বুথিডং সড়ককে ডানে রেখে মেয়াওদের গাড়ি বামে ঘুমধুম রোডে প্রবেশ করেছে। মোড় অতিক্রম করার সময় মেয়াও লক্ষ্য করেছে মসজিদটির নাম “পুরান মাথা মসজিদ”। ইংরেজি, বার্মিজ ও আরবি ভাষায় স্পষ্ট অক্ষরে মসজিদের নাম লেখা আছে। ঘুমধুম সড়কে একশো বিশ মিটার অতিক্রমের পর আরো একটি প্যাগোডা। মসজিদ-প্যাগোডার সহ অবস্থান দেখে বুঝতে পারলো অতীতে এখানকার ধর্মীয় সম্প্রীতি সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিলো। হঠাৎ সোয়ে সানের কথায় ভাবনায় ছেদ পড়লো।


“ভাইয়া! মেয়মা মার্কেটের সামনে একটু থামিও। পাপ্পা ভোরে ওখানে আসেন।”
“ওকে” বলে ডানপাশে ইন্ডিকেটর দিয়ে পার্কিং করলো পিদাও সান।
তিন জনই গাড়ি হতে নেমে এসেছে। ভোরের আলো ফুটে ওঠার পূর্বেই এখানে বেশ লোক সমাগম। মংডু শহরের বড় ও বিখ্যাত মেয়মা মার্কেট পাইকারদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। বাংলাদেশ হতে আমদানী-রপ্তানীর অন্যতম কেন্দ্র মংডু শহরের মেয়মা মার্কেট।
সোয়ে সান একটি বড় দোকানের সামনে এসে হতাশ হলো।
: “ভাইয়া! পাপ্পা প্রতিদিন খুব ভোরে দোকান খুলে মসজিদে যান। কিন্তু আজ বন্ধ!”
: “হয়তো কোন কারণে তিনি আসতে দেরী হয়েছে। চলো। বাড়িতে গেলে সব পরিষ্কার হবে।”
: “চলো।”
আবার ছুটে চলছে গাড়ি। লক্ষ্য মংডু শহরের কেয়ানডাং। মেয়াওকে উদ্দেশ্য করে সোয়ে সান বললো,-
“সত্যি আমি খুব চিন্তায় আছি। মার্কেটটি পাপ্পার নিজের। তিনি প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার পূর্বেই মার্কেটে চলে আসেন। একটি পাইকারী দোকান তিনি নিজেই করেন। আজ না আসাটা আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগছে।”
পিঠে হাত দিলে পিদাও দেখে ফেলবে সে ভয়ে সোয়ে সানের মাংসল রানে ডান হাতে মৃদু চাপ দিয়ে অভয় বাণী শুনালো মেয়াও চু,-
: “ডোন্ট অ্যরি ডার্লিং। ওয়েট এন্ড সি।”
হঠাৎ গাড়ি থেমে যাওয়ায় উভয়ে বাইরে তাকিয়ে হতবাক। ডজনেরও বেশি সাব-মেশিনগানের নল তাদের গাড়ি ঘিরে রেখেছে! পিদাও ড্রাইভিং সিটের পাশের কাচ নামিয়ে বললো,-
: “সমস্যা কী?”
: “ওহ! আপনি! কোথায় যাচ্ছেন? সাথে কারা?” মেজর পদবীর এক সামরিক অফিসারের জিজ্ঞাসা।
: “ওরা আমার ছোট ভাই-বোন। ইয়াঙ্গুনে পড়ে। বেড়াতে এসেছে। তাদের নিয়ে একটু ঘুরে বেড়াচ্ছি।”
: “ঠিক আছে। সাবধানে যাবেন। পরিস্থিতি তো আপনি বুঝতেছেন।”
: “ওকে। ধন্যবাদ।” বলে ব্রেক হতে পা ওঠিয়ে এক্সিলেটরে প্রেসার দিলো পিদাও সান। ৪৫-৫০ কিঃমিঃ বেগে স্বাভাবিক গতিতে যাচ্ছে।
: “ভাইয়া! এসে গেছি! ডানে মোড় নাও। এদিক দিয়ে কাছে হবে!” সোয়ে সানের উত্তেজিত আহ্বান। আপন কারো সাথে দীর্ঘদিন পরে দেখা হলে যে উত্তেজনা বিরাজ করে তার চেয়েও বেশি উত্তেজিত সোয়ে সান। মেয়াও একটু অবাক হলেও কিছু বললো না। কেয়ানডাং এলাকায় প্রবেশ করছে গাড়ি। বেশ কয়েক জায়গা হতে ঊর্দ্ধমুখী ধোঁয়া উড়ছে। পিদাও উভয় পাশের কাচ ডাউন দিয়েছে। বাতাসে পোড়া গন্ধ! সোয়ে সানের মুখের সকল প্রদীপ মুহূর্তে নিভে গেছে। পিদাও চরম উৎকণ্ঠিত। মেয়াও অজানা উদ্বেগে কাঁপছে।
গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। কেয়ানডাং এর ভিতরের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। সব মাটির সাথে মিশে গেছে।


গতরাতের প্রবল বৃষ্টিও আগুনের লেলিহান শিখা থামাতে পারেনি। মেয়াও ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে গেলো। এটা কিভাবে সম্ভব! নিশ্চয় কোন দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কী নির্মমতা!
একটি দুতলা বাড়ির সামনে এসে পিদাও গাড়ি থামিয়েছে। সোয়ে সান চরম বিপর্যস্ত। দু’কূল ছাপিয়ে পানির ফোয়ারা বয়ে যাচ্ছে। তিন জনই ছুটে গেলো সম্পূর্ণ পোড়ে যাওয়া বাড়ির কাছে। এখানে আগুন নিভে গেছে। বাড়ির দেয়ালগুলো কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। বাড়ির অভ্যন্তরে কিছুই অবশিষ্ট নেই! সব পোড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।

সোয়ে সান বাড়ির আঙিনায় মাটিতে বসে পড়লো। পিদাও পরম মমতা সহকারে সোয়ে সানকে দাঁড় করিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো।
: “বোন! তুই আমাদের কলিজার টুকরো। কাঁদিস না বোন। কাঁদিস না। কান্না নিজেকে দুর্বল করে, শত্রুকে সন্তোষ্ট করে।” অনেকটা বিলাপের সুরে পিদাও।
: “ভাইয়া! ওরা এতো নিষ্ঠুর! পুরো পরিবারকে এভাবে বন্দি করে আগুন দিতে পারলো!”
: “রশিদুল চাচা আমার বাবার চেয়েও কম শ্রদ্ধার নন। তিনি আমাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর মতো সৎ ও সজ্জন ব্যক্তির প্রতি এমন নিষ্ঠুরতার বিচার ইহধামে না হলে পরধামে হবেই হবে।”
: “পাঁচ বছরের হামিদুল ও সাত বছরের রহিমুলের কী দোষ ছিলো! ওরা তো অন্তত তাদেরকে না মেরে পারতো!” বাঁধ ভাঙা কান্নার চাপে কথা বের হচ্ছে না সোয়ে সানের।
: “আসলে সন্ত্রাসীদের কোন রাষ্ট্র হয় না, ধর্ম হয় না। সন্ত্রাস মানে নীতি-নৈতিকতাহীন পশুত্ব।”
উত্তর দিকের একটি গাছের গোড়ায় ছুটে গেলো সোয়ে সান। এক বর্গফুটের কী যেন ওঠিয়ে নিয়েছে। মেয়াও চু এবং পিদাও সান ধীর পায়ে সোয়ে সানের কাছে গেলো। লেখার ধরণ দেখেই বুঝতে পারলো কোন কবিতার হস্তলিপি।
: “কী এটা?” মেয়াও চ’র প্রশ্ন।
: “হয়তো শেষ মুহূর্তে নিজেদের পরিণতি বুঝতে পেরে পাপ্পা-মাম্মা এটি আমার জন্য রেখে গেছেন। এটি আমার অবশিষ্ট জীবনের বেঁচে থাকার অবলম্বন।” আবেগে কেঁপে কেঁপে সোয়ে সান।
: “এটি কোন ভাষায় লেখা?” ভাষা বুঝতে না পেরে মেয়াও’র জিজ্ঞাসা।
: “বাংলা”। পিদাও সান জবাব দিলো।
: “বাংলা!” ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেছে মেয়াও চু।
: “হুম! বাংলা! প্রাণের বাংলা ভাষা! আমার অহংকারে প্রতীক বাংলা ভাষা!”
মেয়াও চু’র বিষ্ময়ের শেষ নেই। ঘটনা কি! বাংলা ভাষা, পরিবার, রশিদুল, কবিতা কিছুই মিলাতে পারছে না!
মেয়াও সোয়ে সানের হাত ধরে গাড়ির কাছে এগিয়ে নিলো। গাড়ির কাছে এসে সোয়ে সান আবার পিছনে ফিরে বিলাপ শুরু করলো। মেয়াও বেশ ভালো বুঝতে পারছে সোয়ে সান স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।
: “সোয়ে! বি কোল্ড! প্লিজ কন্ট্রোল ইউর ইমোশন!” সোয়ে সানের কাঁধে হাত রেখে মেয়াও চু শান্তনা দিচ্ছে।
: “মেয়াও! আমার সব শেষ!” মেয়াওকে জড়িয়ে ধরে বিষাদের ভার হালকা করতে চাইলো সোয়ে সান। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,- “আজ আমি সব বলবো। কিছুই গোপন করবো না। আমার জীবনের সকল বোঝা আজ ঝেড়ে ফেলবো। সব শুনে হয়তো তুমি আমাকে চরম ঘৃণা করবে। তাও আমি বলবো!”
বোন এবং বোনের বন্ধুর এমন আবেগঘন পরিবেশ দেখে পিদাও সান দূরে আড়ালে সরে গেছে।
: “তোমার জীবনে কী এমন কলঙ্ক আছে যে, আমি তোমাকে চরম ঘৃণা করবো?” বিষ্ময় নিয়ে মেয়াও চু।
: “মহাকবি আলাওলের নাম শুনেছো?”
: “হ্যাঁ। শুনেছি। তিনি তো রাখাইন মানে সাবেক আরকান রাজসভার কবি ছিলেন।”
: “আমি তাঁর একাদশতম প্রজন্ম।” স্বাভাবিক হয়ে মেয়াও চু’র প্রতি স্থির দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে সোয়ে সান।
: “এ্যাঁ!” লাফিয়ে ওঠলো মেয়াও চু যেন ইলেকট্রিক শক খেয়েছে।
: “হ্যাঁ! মহাকবি আলাওলের সরাসরি দশম প্রজন্ম আমার পাপ্পা রশিদুল। আমি একাদশতম। আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছো! আমাকে কী গলা টিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে? নাকি বর্মি মিলিটারি কুত্তাদের হাতে তোলে দিতে ইচ্ছে করছে? প্লিজ মেয়াও। বার্মিজ কুত্তাদের হাতে তোলে দিয়ে আমাকে অপবিত্র করার চেয়ে তুমি নিজেই গলা টিপে মেরে ফেলো। আমি বিন্দু মাত্র বাধা দেবো না!”
সোয়ে সানের মুখ চেপে ধরেছে মেয়াও চু। আবেগ মিশানো গলায় বলছে,-
“চুপ করো! এটা জানার পর আমার মনে তোমাকে পাওয়া না পাওয়া নিয়ে যে শঙ্কা ছিলো তা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়েছে। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধি সৌধে সাপের দংশনে তুমি “আল্লাহ” শব্দে আর্তনাদ করে ওঠেছিলে। তখনই আমার কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিলো। আমার কাহিনী পরে বলবো। আগে তোমার কাহিনী শুনতে চাই। তুমি আলাওলের বংশধর, রশিদুল নামের ভদ্রলোক পাপ্পা, ভদ্রলোকের স্ত্রী মাম্মা, আবার সিমান সান আঙ্কেল তোমার বাবা, পিদাও তোমার ভাই, কিয়াও আন্টি তোমার মা! এসব জটিল হিসাব আমি মিলাতে পারছি না! মিলিয়ে দাও।”
: “১৯৯২ সালে দেশে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিলো। দাঙ্গা না বলে নিধন অভিযান বলাই শ্রেয়। কারণ একতরফা দাঙ্গা হয় না, নির্মূল অভিযান হয়। তখন আমার বয়স দুই বছর। সবে পাপ্পা-মাম্মা বলতে শুরু করেছি। যাকে বাবা বলি সিমান সান হলেন আমার পাপ্পার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার দাদু ভাই এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বাবার বাবা। শুনেছি আমার পূর্ব পুরুষ মহাকবি আলাওল যখন আরকান রাজসভার সভাকবি মনোনীত হন, তখন বাবার পূর্ব পুরুষ কাহ্নাই সান এর সাথে তাঁর গভীর সখ্যতা হয়। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে উভয়ই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো ছিলেন। বংশপরম্পরা সেই সুসম্পর্ক শতাব্দির পর শতাব্দি অমলিন থেকেছে। ১৯৯২ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পাপ্পা-মাম্মা আমার জীবন নিয়ে চরম শঙ্কায় পতিত হন। সার্বিক বিষয় বাবাকে খোলে বললে তিনি অনেকটা জোর করে নিজের মেয়ের মর্যাদা দিয়ে আমাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। কোন মেয়ে সন্তান না থাকায় আমি তাদের পৃথিবীতে পরিণত হই। আমাকে দেওয়ার সময় বাবা কয়েকটি শর্ত দিয়েছিলেন। আমার ধর্মীয় পরিচয় ঠিক রাখতে হবে, তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, মুসলিম প্রাইমারি এডুকেশন শিক্ষা দিতে হবে, হালাল খাবার খাওয়াতে হবে, নিজের মেয়ের মতো মানুষ করতে হবে, আঠারো বছর বয়স হলে বংশ পরিচয় স্পষ্ট করতে হবে, মুসলিম সম্ভ্রান্ত বংশে বিয়ে দিতে হবে ইত্যাদি। বাবার জন্য শর্তগুলো পালন করা কঠিন হলেও তিনি সানন্দে রাজি হয়ে যান, এবং অক্ষরে অক্ষরে সকল শর্ত পূর্ণ করেন।
দুই বছর বয়সে প্রকৃত বাবা-মাকে হারিয়ে আমি সর্বদা বিমর্ষ থাকতাম। প্রতিদিন কমপক্ষে একবার বাবা আমাকে পাপ্পা-মাম্মার কাছে নিয়ে যেতেন।
তখন হতে প্রকৃত বাবাকে পাপ্পা, মাকে মাম্মা এবং পাপ্পার বন্ধু যিনি নিজের সন্তানের চেয়ে বেশি আদর-স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন তাকে বাবা এবং যে মায়ের ভালোবাসার চাদরে আবৃত থেকে বড় হয়েছি তাকে মা বলতে শুরু করেছি। বাবা-মা আমাকে ভাইয়া পিদাও’র চেয়েও ঢের বেশি আদর-স্নেহ করেন। সকল সুবিধাও আমাকে বেশি প্রদান করেন। তাও ভাইয়ার কোন অভিযোগ, ক্ষোভ বা অভিমান নেই।”

দীর্ঘ জীবন কাহিনী বলে শেষ করলো সোয়ে সোয়ে সান।
মেয়াও আশ্চর্য হয়ে শুনেছে চির সংগ্রামী এক পরিবারের সোনালি অতীত ও তাঁর প্রিয়তমার বিষাদময় জীবন কাহিনী। ইতিমধ্যে দু’ফোটা অশ্রু বিসর্জিত হয়েছে।
গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে পিদাও সান। দু’জনই নিজেদেরকে সামলে নিয়েছে।

মুহাম্মদ ইয়াকুব, কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিসট

পর্ব – সাত’র লিংক :

আরকানি ফুল (পর্ব- সাত): মুহাম্মদ ইয়াকুব

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.