পর্ব-৪

ইনায়া লেকের নির্জন এক প্রান্তে সবুজ ঘাসের উপর বসে আছে মেয়াও চু এবং সোয়ে সোয়ে সান। ইয়াঙ্গুনের এই লেকটি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। এই লেকের এক প্রান্তে আছে কথিত শান্তির নেত্রী অং সান সুচির বাসভবন। মূলত তাঁর বাসভবন কেন্দ্রীক দর্শণার্থীদের ভিড় বেশ লক্ষ্যণীয়। অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি পরিবেশের জন্য মেয়াও এবং সোয়ে বসার জায়গা নির্ধারণ করেছে সুচির বাসভবনের বিপরীত প্রান্তে পাহাড়ের ঢালুতে বিছানো সবুজ ঘাসের কার্পেটের উপর।

সোয়ে সান মেয়াও’র দিকে দৃষ্টি ফেলে আশ্চর্য হয়ে গেলো। মেয়াও একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে! যেন ধ্যানমগ্ন সন্যাসী ইস্পিত লক্ষ্যের সন্ধানে নিমগ্ন! 

সোয়ে সানও পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেয়াও চু’র দিকে। একজন সুদর্শন পুরুষের যত গুণাবলী, সবই আছে তার ভিতরে এবং বাইরে। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা পেটানো শরীর। বাম কপোলে দর্শণীয় একটি কালো তিলক। সুগভীর দীঘল কালো চক্ষু যুগল যে কোন নারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। উজ্জ্বল শ্যামলা শরীর মায়ানমারের মগ জাতিগোষ্ঠীর সাথে কেমন যেন বেমানান।

মেয়াও চু যেন হারিয়ে গেছে সোয়ে সানের রূপসাগরে। যৌবন প্রান্তরে যে রূপসীর কল্পনা চিত্রায়িত হয়েছে বার বার, এ যেন সেই ললনা। যৌবনের উপচে পড়া ঢেউ শরীরের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে খেলা করছে। কিন্তু ওর সাথে পরিণয় তো সম্ভব নয়! এ যে জাতিসত্তার প্রশ্ন!

দীর্ঘক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বেজে উঠলো সোয়ে সানের রিমঝিম মাদক সুর,-

: “কী ভাবছেন?”

: “তেমন কিছু না।” বললো অপ্রস্তুত মেয়াও চু।

: “ওহ। ধ্যানমগ্ন দেখে মনে হলো কিছু একটা ভাবছেন!” স্মিত হেসে সোয়ে সান।

: “দেখুন, সামনের যে ঐতিহাসিক বাড়িটা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুচির প্রয়াত বাবা অং সান সেখানে বসে রোহিঙ্গা নেতাদের সাথে কত সিটিং মিটিং করেছিলেন! স্বাধীনতাপূর্ব ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে একযোগে কাজ করা রোহিঙ্গারা এখন আমাদের দেশের নাগরিকই না! অং সানের প্রজন্ম ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও আমরা ইতিহাস অস্বীকার করছি। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য চরম লজ্জার।” প্রসঙ্গ পাল্টে মেয়াও চু’র বক্তব্য।

: “বুকফাটা কান্নাটা কাকে দেখাবো! আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণটা যদি কাউকে দেখাতে পারতাম। যদি সব আবেগ উপচে ফেলে একটু হালকা হতে পারতাম! জানি না এমন সৌভাগ্য আমার হবে কিনা! আমি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখছি, নাকি দুঃস্বপ্ন!” আবেগঘন কণ্ঠে সোয়ে সান।

সোয়ে সানের হৃদয় ছোঁয়া কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো মেয়াও চু! মায়ানমারের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী সিমান সানের একমাত্র মেয়ের এতো দুঃখ! নাকি আমার প্রতি সে অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে গেছে!

: “সোয়ে সান! আপনার ভিতরে এতো কষ্ট, ক্ষোভ ও হাতাশা কেন! আপনি কী আমাকে সবচেয়ে কাছের বন্ধু, জীবন সংগ্রামের সহকর্মী বিবেচনা করতে পারেন? পারেন কী আমার সাথে আপনার দুঃখগুলো শেয়ার করতে?”

মেয়াও চু’র অতি মানবীয় আশ্বাস পেয়ে চঞ্চলা হরিণীর মতো চমকে উঠলো সোয়ে সান। গালের দু’পাশের মসৃণ ত্বক বেয়ে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো সবুজ মাঠে।  হৃদয়ে টর্নেডো বয়ে যাচ্ছে। কিভাবে সম্ভব! বিধ্বস্ত জাহাজের একজন যাত্রী হয়ে এতো বড় স্বপ্ন কিভাবে সফল হবে! এ তো আকাশ কুসুম চিন্তা!

: “মেয়াও! আপনি কোথাও ভুল করছেন! আমি আসলেই আপনার সার্বক্ষণিক সাথী হওয়ার যোগ্য নই। আমি নিতান্ত হতভাগা ক্ষুদ্র এর নারী।”

: “আপনি যাই হোন না কেন আমি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম!” দৃঢ়তার সাথে মেয়াও চু’র জবাব।

: “হাত দাও! আমার সংগ্রামী জীবনে তোমাকে স্বাগতম।” নিজের ডান হাত মেয়াও চু’র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সোয়ে সান।

মেয়াও হাত বাড়িয়ে সোয়ে সানের কোমল হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো। প্রথম স্পর্শের চেয়ে ভিন্ন অনুভূতির সৃষ্টি হলো মেয়াও চু’র ভিতর-বাহিরে। 

: “সোয়ে সান! তোমাকে স্বাগতম আমার অচিনপুরের অন্দর মহলে!”

: “বাবা, মা ও ভাইয়া গতকাল মংডুতে ফিরে গেছেন। সেখানে যাওয়া আমার জন্য খুবই জরুরী।”

: “না। তুমি মংডুতে যাবে না। যেখানে পাখির মতো মানুষ মরছে, সেখানে তোমার যাওয়া খুবই বিপদজ্জনক।”

: “আমার পরিবার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমাকে যেতেই হবে।”

: “মানে? তোমার পরিবার তো সমগ্র মায়ানমারে পরিচিত ও শ্রদ্ধেয়! সেখানে তো শুধু রোহিঙ্গাদের নিধন করা হচ্ছে।”

: “আমার যে পরিবার তুমি দেখেছো সেটাই আমার একমাত্র পরিবার নয়। ঐ পরিবারের বাইরে আমার আরো একটি পরিবার আছে। যে পরিবার আমার কাছে এই পরিবারের চেয়ে কোন অংশেই কম নয়!”

মেয়াও চু ভাবনার অতলে হারিয়ে গেলো। কি ব্যাপার! অস্পষ্ট ক্রমশ ঘনিভূত হচ্ছে। প্রচ্ছন্ন ধোয়াশা ছেয়ে যাচ্ছে চিন্তার দিগন্তে। কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছি না! এর মূল রহস্য উদঘাটন করতেই হবে!

: “সোয়ে সান! তুমি যাবে ঠিক আছে। তবে আমি মনে করি কয়েকদিন পরে যাওয়াটাই উত্তম হবে।”

: “কয়েক দিন না চু। কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করাও আমার জন্য দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে। আমারে বাইরে সতেজ, ভিতরে প্রলয়। মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়ায় নীল সাগরের তীরে আছড়ে পড়ে জলোচ্ছ্বাস”

: “তোমার হৃদয়ে দেখছি গভীর ক্ষতচিহ্ন। সব বিষয় আমাকে খুলে বলতে পারো।”

: “যা বলার তা তো বলেছি। বলার কিছুই অবশিষ্ট নেই।”

কিছুক্ষণ ভেবে বললো সোয়ে সোয়ে সান। স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনই খই ফোটানো যাবে না। হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে!

: “যাক। বিশ্বাস না করলে বলার প্রয়োজন নেই। তবে এখনই তোমার মংডু যাওয়াটা নিরাপদ নয়।”

: “বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা নয়। আমি আগামীকাল নাইট কোচে মংডু যাত্রা করছি। যদি বৌদ্ধের কৃপায় বেঁচে থাকি, তবে দেখা হবে আবার।”

: “তোমার আবেগকে সম্মান করি। আমার একটা ছোট্ট আবদার আছে। একনিষ্ট বন্ধু হিসেবে আশা করি তুমি আবদারটি রাখবে।”

: “রাখার চেষ্টা করবো। বলো।”

: “আমিও তোমার সাথে মংডু যাবো। বৌদ্ধের কৃপায় দু’জনই একসাথে আবার ফিরে আসবো।”

মেয়াও চু’র স্থির সিদ্ধান্তের কথা শুনে সোয়ে সান আঁতকে ওঠলো,-

: “সর্বনাশ!বলেন কি!”

: “এটা আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তুমি আমাকে তোমার সাথে নাও বা না নাও, আমি যাবই যাব। মৃত্যু ব্যতীত কোন প্রতিবন্ধক এই সিদ্ধান্ত হতে আমাকে একচুল পরিমাণ নড়াতে পারবে না।”

: “দেখো, তুমি নিজেই বলেছো, এই মুহূর্তে মংডু ভ্রমণের জন্য নিরাপদ না। কিন্তু এখন—-” অনেকটা আতঙ্কিত ও জড়োসড়ো হয়ে সোয়ে সোয়ে সান।

ভিতরে ভিতরে চাপা আর্তনাদ তাকে উৎকণ্ঠিত করছে। সব প্রকাশিত হয়ে যাবার ভয় অতি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে বললো,-

: “আমি যাচ্ছি ঠিক আছে। কিন্তু, সাথে তুমিসহ গিয়ে দু’জন একসাথে বিপদে পড়ার কোন মানে হয় না। সেখানে প্রতি পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করছে।”

: “মংডুর সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি যথাযথ অবগত আছি। তুমি আমার প্রতি আস্থা রাখতে পারো যে, আমার দ্বারা তোমার কোন অমঙ্গল হবে না।”

: “সামরিক বাহিনী ওখানে এখন কারো পরিচয় শুনার সময় নিচ্ছে না। দেখা মাত্র গুলির নিয়ম চলছে।”

: “আমি জানি। শুধু সামরিক বাহিনী নয়। সামরিক বাহিনীর চেয়ে বেসামরিক মগ বাহিনী ও কিছু কিছু উগ্রপন্থী প্যাগোডার কার্যক্রম আরো বেশি জঘন্য ও মানবতা বিরোধী।”

: “তোমার কাছে হেরে গেলাম। ঠিক আছে দু’জনই যাবো, একসাথেই যাবো।”

“হুররে” উল্লাসধ্বনিতে লাফিয়ে উঠে সোয়ে সানকে বাহুডোরে আবদ্ধ করলো মেয়াও চু। অতিমাত্রার আনন্দের অনেকটা কোলে নিয়ে সোয়ে সানের ঘাড়ে মুখ লুকালো। আলতো ঠোঁটের স্পর্শে নীরব ইশারায় অভয়বাণী শুনালো।

হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলো মেয়াও চু। অনুশোচনায় মুখ নিচু রেখে বললো,-

: “সরি। আবেগ ধরে রাখতে পারিনি।”

রোমাঞ্চিত আরকানি ফুল সোয়ে সোয়ে সান যেন লাজরাঙা লজ্জাবতী। শক্ত সামর্থ যুবক পুরুষের কঠিন বাহুবন্ধনে সোয়ে যেমন নতুন আবিষ্কারে আন্দোলিত, ঠিক তেমন প্রথম অভিজ্ঞতায় লজ্জিত। লজ্জাবনত সোয়ে সান মৃদু হেসে বললো,-

: “ইট’স ওকে। নো প্রবলেম। বাট বি কেয়ারফুল।”

: “থ্যাংকস এ লট। ইট ওয়াজ এন এ্যাক্সিডেন্ট।”

: “এ্যাক্সিডেন্ট ইজ এ্যাক্সিডেন্ট। সো ডোন্ট অ্যরি।”

: “এখন কী উঠবে?” পরিস্থিতি হালকা করার উদ্দেশ্যে মেয়াও চু।

: “না। সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকতে চাই। তোমার সাথে সময় কাটাতে বেশ ভালো লাগছে।”

: “তাই!”

: “হুমম”

: “চলো একটু হাঁটি।”

: “চলো।”

লেকের কিনারা ঘেসে পাশাপাশি হাঁটছে মেয়াও চু এবং সোয়ে সান। লেকের স্বচ্ছ নীল জলরাশি নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করলেও আজ মোটেও এমনটা মনে হচ্ছে না। কেন যেন মনে হচ্ছে বিশাল জলরাশি লেকের পাশের ঐতিহাসিক ঐ বাড়িটার ছেড়ে দেওয়া নীল হেমলক!

: “স্যার! বাদাম লাগবে বাদাম?” কিশোর কণ্ঠের আহ্বানে ডান পাশে তাকিয়ে দেখলো দশ-এগারো বছরের শ্যামবর্ণের এক ছেলে বাদামের টোঙ্গা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

: “কত করে?” মেয়াও চু ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলো।

: “এক টোঙ্গায় ১০০ গ্রাম করে আছে স্যার। প্রতিটি ৭০ কিয়াট (মায়ানমারের মূদ্রার নাম কিয়াট)।”

: “দুই টোঙ্গা দাও।”

: “না না। দুইটা নয়, একটা দাও।” দ্রুত গলায় সোয়ে সান। সোয়ে সানের কথা শুনে কিশোর ছেলেটির মুখ বিমর্ষ হয়ে গেলো। সোয়ে এবং মেয়াও দুজনই বিষয়টা অবজারভ করলো। সোয়ে আদুরে গলায় ছেলেটিকে বললো,- “এই বাবু, আমরা একটা নেবো। দাম কিন্তু দুইটার দেবো।”

বাদাম বিক্রেতা ছেলেটির ঝকঝকে দাঁত বের হয়ে মুখটা প্রশস্ত হয়ে গেলো।

বাদাম নিয়ে আবার বসে পড়লো প্রায় লেকের পানির কাছেই। খোসা খসিয়ে পরস্পর বাদামের বিচি বিনিময় হচ্ছে। এক ফাঁকে মেয়াও ছেলেটিকে ডাকলো,-

: “এই ছেলে! এদিকে এসো। তোমার নাম কি?”

: “আব্দুল্লাহ!” স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে ছেলেটি।

: “এ্যাঁ! কি বললে?” মেয়াও এবং সোয়ে দুজনই লাফিয়ে ওঠলো। যেন অষ্টমাশ্চর্য তাদের সামনে। মায়ানমারের চলমান সহিংসতায় কোন মুসলমান অপরিচিত কাউকে নিজের মুসলিম পরিচয় দেয় না! অথচ এতটুকু একটা বাচ্চা ছেলে! তাও বাদাম বিক্রেতা!”

: “জ্বি। আমার নাম আব্দুল্লাহ। আমি কী আপনাদের কোন সমস্যায় ফেলেছি? আমাকে কী বাদামের মূল্য পরিশোধ করতে আপনাদের বিবেক বাধা দিচ্ছে? ঠিক আছে। দিতে হবে না। কোটি কোটি কিয়াটের সম্পদ দিয়ে দিয়েছি, সেখানে ৭০ কিয়াট কোন ব্যাপারই না।”

আশ্চর্য! আরো বেশি বিষ্ময় ঘিরে ধরেছে দু’জনকে। বলে কি ছেলেটি!

: “তোমার বাবার নাম কি? তিনি কী করেন?” সোয়ের প্রশ্ন।

: “আমার বাবার নাম আব্দুল মালেক। আমার দাদা আব্দুল হামিদ মায়ানমারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য। ইয়াঙ্গুনের ৩৬ নাম্বার ওয়ার্ডে আমাদের তিন একর জমির উপর দু’তলা বাড়ি ও তিন তলা মার্কেট ছিলো। গত বছর দাঙ্গার সময় উগ্রবাদীরা আমাদের বাড়িতে আগুন দেয় ও বাবাকে আমাদের সামনে নির্মমভাবে খুন করে। মা এবং এক বোনকে কয়েক ডজন নোংরা উগ্রবাদী ভয়াবহ দৈহিক নির্যাতন করে স্টোর রোমে বন্দি করে রেখে বাইরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। অপর বোন তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমাকে নিয়ে পালিয়ে চলে আসে।”

অবাক হয়ে শুনছিলো কিশোর আব্দুল্লাহর কথা।

: “তোমরা এখন কোথায় থাকো?”

: “ঐ রাতেই আমরা চলে আসি এখানে। গভীর রাতে লেকের পাড়ে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ি। আমার দু’চোখে নেমে এসেছিলো রাজ্যের ঘুম। আমার বোন অবসাদগ্রস্থ হলেও আমার জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। তিনি আমাকে জোর পূর্বক জাগিয়ে তুলেন। দুই ভাই-বোন লেকের জলে হাত-মুখ ধৌত করে পূর্ব দিকের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাঁটতে থাকি। রক্তিম পূর্বাকাশ যখন ফর্সা হতে থাকে তখন আমরা একটি ছোট্ট উপত্যাকায় দাঁড়িয়ে।”

: “তারপর?” মেয়াও উদ্বেগভরা কণ্ঠে।

: “আপনাদের পরিচয় না জেনে আর বলতে পারবো না।”

: “একটু আগেই তো সাহসিকতার সাথে নিজের পরিচয় গিয়েছিলে! এখন ভয় পাচ্ছো কেন?” সোয়ে সানের উক্তি।

: “আমাদের পরিচয় জানার প্রয়োজন নেই। আমাদেরকে বিশ্বাস করতে পারো। দেখে কী মনে হয় না যে, আমরা হিংস্র জাতের না?” সোয়ে সানের রেশ ধরে মেয়াও চু।

: “আপনাদেরকে বিশ্বস্ত মনে হওয়ায় সঠিক পরিচয় বলেছি। আমার জীবনের চেয়ে আমার বোনের সম্ভ্রম আমার কাছে বড়। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে বলবো কিনা ভাবছিলাম। বাকিটাও বলছি। সকালে সূর্যালোকে আমরা উপত্যাকার মধ্য দিয়ে হেঁটে একটি পাহাড়ী গিরিপথ পাই। ঐ পথ হয়ে সামনে অগ্রসর হলে একটি বড় গুহার সন্ধান পাই। গুহাটিকে আমরা নিজেদের জন্য উপযোগী করে তুলি। সেখানে ২০১৬ হতে বসবাস করে আসছি। আমি শহর হতে কাচা বাদাম নিয়ে যাই। আমার আপু ফাতেমা সেগুলো ভেজে দেয়। পরে এখানে নিয়ে এসে বিক্রি করি।”

দু’জোড়া অবাক নয়ন বিমুগ্ধ নয়নে কিশোর আব্দুল্লাহকে দেখছে আর ভাই-বোনের অসামান্য সাহসিকতার কাহিনী শুনছে।

মেয়াও চু পকেট হতে মানি ব্যাগ বের করে আব্দুল্লাহর হাতে দশ হাজার কিয়াটের একটি বান্ডিল ধরিয়ে দিলো। 

আব্দুল্লাহ বিষ্ময় নিয়ে মেয়াও চু’র দিকে তাকিয়ে বললো,-

“পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে আমরা গরিব হতে পারি, তবে ভিক্ষুক নই। আমার প্রাপ্য সত্তর কিয়াট দেন।”

: “তুমি আমাদের ভাই এর মতো। এই অল্প টাকা তোমাদের এক ভাই-বোনের উপহার হিসেবে গ্রহণ করো। কোন ভাই-বোন তাদের অপর ভাই-বোনের প্রতি ভিক্ষার হাত বাড়ায় না। দায়িত্বের হাত এবং উপহারের হাতই বাড়ায়। এখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। তুমি বহুদূর যাবে। দ্রুত চলে যাও, আমরা চলে যাচ্ছি।”

ছলছল নয়নে দ্বিধাজড়িত হাতে টাকাটা গ্রহণ করে আব্দুল্লাহ  নীরবে পাহাড়ী পথে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

মেয়াও এবং সোয়ে সানও গাড়িতে উঠে বসলো। বিদায় বেলায় মেয়াও বললো,-

: “প্রাইভেট নিয়ে যাবো, নাকি বাসে?”

: “প্রাইভেট নিয়ে অতদূর যাওয়া ঠিক হবে না। পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয়।”

: “ঠিক আছে। রাত দশটার বাসে আমি টিকেট কনফার্ম করে রাখবো। সন্ধ্যার পরে আমি বাসায় এসে তোমাকে নিয়ে যাবো।”

: “আচ্ছা। আসি। ভালো থেকো সব সময়!”

বিদায়ী শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে চলতে শুরু করলো মেয়াও চু’র গাড়ি। যতদূর দেখা যায় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সোয়ে সান। গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে বাসার দিকে অগ্রসর হলো।

মুহাম্মদ ইয়াকুব
কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

পর্ব-৩ এর লিংকঃ https://early-star.com/2020/11/07/আরকানি-ফুল-মুহাম্মদ-ইয়াক-2/

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.