মুহাম্মদ ইয়াকুব

পর্ব-৩

প্রশস্ত জিওয়াকা সড়ক হতে তুলনামূলক সরু শোয়ে ডাগন প্যাগোডা রোডে প্রবেশ করলো মেয়াও চু’র গাড়ি। সমাধিসৌধের পার্কিং গ্যারেজে গাড়িটি পার্কিং করে স্থির ও দৃঢ়পায়ে নামলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সমাধি কমপ্লেক্সের দিকে। নির্মম ইতিহাস মানসপটে ভেসে আসছে। ইংরেজদের পর্বতসম জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়ে জন্মভূমিতে মরতে পারেননি ভারতের শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের আত্মত্যাগ পৃথিবীর সব বড় বড় শোক, নির্যাতনের ইতিহাসকে হার মানায়। এ ইতিহাস ভারতবাসীকে এখনো কাঁদায়। এখনো প্রতিদিন হাজারো ভারতবাসী মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ইয়াঙ্গুনের সমাধি বা মাজারে গিয়ে বর্বর পাষণ্ড ইংরেজদের ধিক্কার দেন এবং বাহাদুরের ত্যাগের কথা স্মরণ করে দোয়া করেন। বাহাদুর শাহের সমাধিসৌধটি নয়নাভিরামভাবে সাজানো হয়েছে। পরিপাটি করে সাজানো সমাধিসৌধের সামনে গেলে যে কোন মানুষের স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে এটা কোনো রাজা বা বাদশাহর সমাধি কমপ্লেক্স। সমাধি কমপ্লেক্সে তার নামে একটি সভাকক্ষও রয়েছে। সৌধে প্রবেশ করতেই হাতের ডান পাশে তার নামে করা সভাকক্ষটির সামনেই দেখা যায় বাহাদুর শাহ জাফরের বিশাল পোট্রেট ভাণ্ডার। কমপ্লেক্সের ভেতরের দেয়ালগুলোতেও রয়েছে নানা আকৃতির তার একাধিক পোট্রেট। দেয়ালে শোভা পাওয়া সম্রাটের ছবিগুলোর একটি মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তোলা। বৃদ্ধ সম্রাটকে ওই ছবিতে দেখা যায় খুবই ক্লান্ত, বিবর্ণ এবং বিমর্ষ।
সর্বশেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফরের কথা উপমহাদেশের মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ১৯৯১ সালে হঠাৎ করে তার কবর আবিষ্কৃত হবার পর, তাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে আবার নতুন করে আগ্রহ দেখা দেয়। মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর একজন সুফি-সাধক এবং প্রথিতযশা কবি ছিলেন। ১৮৬২ সালে তদানীন্তন রেঙ্গুনে (বর্তমানে মায়ানমারের ইয়াঙ্গুন) একটা জরাজীর্ণ কাঠের বাড়িতে তিনি যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তার পাশে ছিলেন পরিবারের অল্প কিছু সদস্য। প্রথমে কবরটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যা একসময় নষ্ট হয়ে যাবে, ঘাসগুলো গোটা জায়গা আচ্ছাদিত করে ফেলবে। কোথায় সর্বশেষ মোগল সম্রাট শায়িত আছেন, তার চিহ্নও কেউ খুঁজে পাবে না। মৃত্যুর দিনই ব্রিটিশ সেনারা তাকে শোয়ে ডাগন প্যাগোডার কাছে অতি গোপনীয়তার সাথে অজ্ঞাত এক কবরে দাফন করে। পরে ১৯৯১ সালে তাঁর আসল কবর আবিষ্কৃত ও সমাধিসৌধ নির্মিত হয়। এর মধ্য দিয়ে ৩০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল মোঘল সাম্রাজ্যের শেষ প্রতিনিধিকে ইতিহাসের অন্তরালে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সমা
বাহাদুর শাহ্ জাফরের পূর্বপুরুষরা ৩০০ বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে, যার মধ্যে ছিল বর্তমানের ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বাংলাদেশ। তাঁর পূর্বপুরুষ আকবর বা আওরঙ্গজেবের বর্ণময় শাসনকালের মত দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের শাসনকাল হয়তো তেমন গৌরবোজ্জ্বল ছিল না, কিন্তু তার সময়টা জড়িয়ে গিয়েছিল বিখ্যাত সিপাহী বিদ্রোহের সঙ্গে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়ায়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতিয় সেনাবাহিনীতে বড় ধরণের সেনা অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। ইতিহাসে যেটি “সিপাহী বিদ্রোহ” নামে বিখ্যাত। ওই অভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার পর সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ইন্ধন প্রদানের অভিযোগে দেশদ্রোহিতার দায়ে মামলা করা হয় এবং তাকে বন্দি করে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন রেঙ্গুনে নির্বাসন দেওয়া হয়। বাহাদুর শাহের মতো একজন দেশপ্রেমিক মোগল সম্রাটকে জন্মের অধিকার বঞ্চিত হয়ে নির্বাসিত অবস্থায় অর্ধাহারে-অনাহারে মরতে হয়েছে। ছয় ছেলের মাথা কেটে প্লেটে করে তার সামনে এনে বলা হয়েছে, এরপরও কি দিল্লীর মসনদ চাও? তারপরও নত হননি সম্রাট। বাহাদুর শাহ জাফরের
পুর্বসূরী সম্রাট জাহাঙ্গীরের দয়ায় যারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠনের কৃপা লাভ করেন, সেই অকৃতজ্ঞ ইংরেজদের মিথ্যা ও সাজানো বিচারে ফাঁসির রায় দেয়া হয় বাহাদুর শাহকে। বয়স বিবেচনায় পরে বেঁচে থাকা দুই ছেলে ও স্ত্রী জিনাত মহলসহ ৩২ জনকে কঠোর গোপনীয়তায় তৎকালীন রেঙ্গুনের নির্জন অরণ্যে নির্বাসনে পাঠানো হয়। বন্দি অবস্থায় সেখানেই ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর ৮৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
সম্রাট মারা গেলেও তাঁর সৃষ্ট কবিতাগুলো মরেনি।
তিনি লিখতেন ‘জাফর’ ছদ্মনামে। জীবন ও প্রেম নিয়ে তার রচিত গজল খুবই বিখ্যাত এবং সেগুলো ইয়াঙ্গুনের মুশায়েরাতে প্রায়ই গাওয়া হয়। বন্দি অবস্থায় তার কাগজ কলম ব্যবহারের উপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। বলা হয়, তিনি এসব গজল ও কবিতা কাঠকয়লা দিয়ে লিখে গেছেন যে ঘরে তাকে আটক রাখা হয়েছিল, সেই ঘরের দেয়ালে।
সম্রাট হিসাবে বাহাদুর শাহ্ জাফর কোন সেনাদলের নেতৃত্ব দেননি। কিন্তু ভারতিয় উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলিম সৈন্যরা তাকে নেতা মেনে ঐক্যবদ্ধভাবে বিদ্রোহ করেছিল। ঐতিহাসিকরা বলেন মোঘল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে দুই ধর্মের হাজার হাজার মানুষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ‘লাস্ট মুঘল’ বইয়ের লেখক, খ্যাতিমান ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পিল এক সাক্ষাতকারে বিবিসিকে বলেছিলেন, “জাফর একজন অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ইসলামী শিল্পরীতিতে পারদর্শী, তুখোড় কবি, এবং সুফি পীর যিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যকে গভীর গুরুত্ব দিতেন।”
জাফরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পেছনে অনেক ঐতিহাসিক বলেন বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল মিশ্র ধর্মের পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তার বাবা ছিলেন দ্বিতীয় আকবর শাহ আর মা ছিলেন হিন্দু রাজপুত রাজকুমারী লাল বাঈ। ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হয়ে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর হয়তো তার রাজ্য, ক্ষমতা ও উপাধি হারিয়েছিলেন, কিন্তু একজন সুফি-সাধক, কবি ও ঐক্যের প্রতীক হিসাবে মানুষের অন্তরে চিরস্থায়ী আসন করে নিতে তিনি সফল হয়েছিলেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন, “ভারতে যখন জাতীয়তাবাদ আর মৌলবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, এমন সময়ে জাফরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার আদর্শ আরও বেশি করে সামনে আসা উচিত।”

মেয়াও হাঁটতে হাঁটতে সম্রাটের কবরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বিড়বিড় করে কী যেন পড়ছে আর নয়নজলে কপোল ভিজছে। হঠাৎ কাধে কোমল স্পর্শে পিছনে ফিরে হতবাক! সোয়ে সোয়ে সান!
: “আপনি এখানে? কখন এলেন?” সোয়েকে উদ্দেশ্য করে মেয়াও।
: “চোরের পিছু নিয়ে চলে আসলাম।”
সোয়ের কথা শুনে মেয়াও একটু চমকে উঠলো।
: “মানে? কী বলতে চান?”
: “ক্ষেপছেন কেন! ক্যাম্পাসে আপনাকে অনেক খুঁজেছি। আপনার বিভাগ, লাইব্রেরি, ক্যান্টিন সব জায়গায় খুঁজার পরও কোথাও না পেয়ে এখানে চলে আসলাম। আমার বিশ্বাস ছিলো আপনি এখানেই থাকবেন। বিশ্বাস পূর্ণতাও পেলো।”
: “ও। আসলে ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে অন্য কোন কাজ না থাকলে আমি এখানেই চলে আসি। এখানে আমি আমার অতীত-ঐতিহ্য খুঁজে পাই।”
: “মানে!”
আশ্চর্যান্বিত প্রতিউত্তর পেয়ে মেয়াও আবারো চমকে উঠলো। তড়িঘড়ি বললো,-
: “মানে এখানে অনেক করুণ ইতিহাসের সন্ধান পাই। মানবিক দায়িত্ববোধের কারণেই এখানে আসা।”
: “ও আচ্ছা।”
মেয়াও দেওয়ালে ঝুলানো সম্রাটের মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তোলা ছবিটির দিকে ইঙ্গিত করে বললো,-
: “দেখুন! ভদ্রলোক একজন সম্রাট ছিলেন। তাও যেন-তেন সম্রাট না। দুনিয়া কাঁপানো মোগল সম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাট।”
: “হুম! রাজ্যহীন সম্রাট!”
: “মোটেও রাজ্যহীন নন। তিনি রাজত্ব থাকাকালীন সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর পূর্ব পুরুষদের দয়া ভিক্ষা চাওয়া গোলামরা তাঁর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করেছিলেন।”
: “ইতিহাস তাই বলে।”
গভীর দীর্ঘশ্বাসের সাথে সোয়ে’র দু’চোখ হতে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।
: “আপনার চোখে পানি কেন! একজন মহামেডানের জন্য আপনি কাঁদছেন!”
: “তিনি একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় সম্রাটই নন। তিনি ছিলেন আন্তঃধর্মীয় সেতুবন্ধনের অগ্রনায়ক, স্বাধীনতার মহান স্বপ্নদৃষ্টা। তাঁর জন্য দু’ফোটা অশ্রু বিসর্জন দেয়া যেতেই পারে।”
সোয়ের কথা শেষ হবার পর মেয়াও সোয়েকে উদ্দেশ্য করে বললো,-
: “দ্বিতীয় তলায় চলুন। আপনাকে একটা জিনিস দেখাবো।”
সমাধি কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলায় সংরক্ষিত পরিদর্শন বই এর সামনে এসে থামলো। পৃষ্ঠা উল্টে এক জায়গায় চার চোখ স্থির হলো।
মেয়াও চু বললো,-
: “পড়ে দেখুন।”
ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি রাজীব গান্ধীর সাক্ষরসমেত একটা মন্তব্য। মায়ানমার সফরে গিয়ে তিনি সমাধিসৌধের পরিদর্শন বইতে এটি লিখেছিলেন,- “হিন্দুস্তানে তুমি দু’গজ মাটি পাওনি সত্য। তবে তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।”
: “আমি এখানে অনেক বার এসেছি। কিন্তু এটি দেখার কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি। মূল্যবান একটি ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী করেছেন। আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ।”
আবেগাপ্লুত সোয়ে’র বক্তব্য।
: “আমার মন ভালো না থাকলে এখানে চলে আসি। এখানে আসলে আমার আত্মা প্রশান্তিতে ভরে যায়।”
: “আমারও এখানে আসার অন্যতম উদ্দেশ্য প্রশান্তি। জায়গাটা অনেক নিরিবিলি। শুনেছি এখানে অনেকে আসেন প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে। যদিও আমি এসবে বিশ্বাসী নই তবুও আসি।”
: “কয়েকদিন হতে দেশের যা অবস্থা! মনে হচ্ছে এটি পশুদের দ্বারা পরিচালিত একটি রাষ্ট্র। কিছু অপরাধীর সামরিক ব্যারাকে হামলাকে কেন্দ্র করে মংডু, আকিয়াব, রাথিডং, বুথিডংসহ ইরাবতি পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত অঞ্চলসমূহে যে তাণ্ডব চালানো হচ্ছে তা সুস্থ মস্তিস্কের কেউ পজেটিভলি গ্রহণ করবে না। এসব দুষ্কর্ম দেখে কয়দিন যাবত মনটা খুব খারাপ।”
: “আমি মংডুর মেয়ে। আমাকে বাইরে থেকে দেখে সতেজ মনে হচ্ছে। কিন্তু ভিতরে রক্তাক্ত প্লাবন।”
কান্না জড়িত কণ্ঠে সোয়ে সোয়ে সান।
মেয়াও একটু বিস্মিত হয়ে বললো,-
“এখন পড়ন্ত বিকেল। এখানে লোক সমাগম বাড়ছে। পাশের শোয়ে ডাগন প্যাগোডায়ও অন্যান্য দিনের চেয়ে জনসমাগম বেশি। ওখানে আজ কী যেন একটি অনুষ্ঠানও হওয়ার কথা। চলুন, বিকেলটা একটু নীরবতার মোহে আচ্ছন্ন হই দুজন।”
: “তবে তাই হোক,চলুন যাওয়া যাক।””
সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলো সোয়ে সোয়ে সান।

২য় পর্বের লিংকঃ https://early-star.com/2020/10/11/আরকানি-ফুল-মুহাম্মদ-ইয়াক/

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.