পর্ব-পাঁচ

ইয়াঙ্গুন বাস টার্মিনাল। বাসে পাশাপাশি বসে আছে মেয়াও চু এবং সোয়ে সো

য়ে সান। সুপরিচিত ও কাঙ্খিত বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে সড়কপথে দীর্ঘ পথযাত্রা দুজনের জন্যই নতুন অভিজ্ঞতা। বিলাসবহুল বাসটি বাস চলতে শুরু করেছে। লক্ষ্য-রাখাইন রাজ্যের মংডু শহর। কঠিন পরিস্থিতিতে রাখাইন (সাবেক আরাকান) রাজ্য ভ্রমণ মেয়াও’র চিন্তাশক্তি যেমন এলোমেলো করছে, তেমন রোমাঞ্চিত করছে। মেয়াও হারিয়ে গেলো ভাবনার রাজ্যে। মায়ানমারে যেসব প্রাচীন জাতিসত্তা এখনো সমহিমায় উদ্ভাসিত তার মধ্যে তাদের মন জনগোষ্ঠী এবং সোয়ে সানদের পাইয়ূ জনগোষ্ঠী প্রধান। মগ সম্প্রদায় মঙ্গোলিয় অঞ্চল হতে এসেছে তাদেরও অনেক পরে। এমনকি যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে যুগ যুগ ধরে সকল প্রকার নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত করে আসছে তাদেরও অনেক পরে মায়ানমারে বসতি স্থাপন করেছে মগ জাতি।

জনশ্রুতি আছে যে, সাতশো শতকের শেষের দিকে কয়েকটি আরব মুসলিম বাণিজ্য জাহাজ সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে আরকান উপকূলে এসে ভিড়ে। জাহাজের যাত্রীরা উপকূলের নিকটবর্তী হয়ে “রহম” “রহম” ধ্বনিতে স্থানীয় জনসাধারণের সাহায্য কামনা করে। রহম আরবি শব্দ। শব্দটির অর্থ “দয়া করো”। এই রহম শব্দ হতে “রোয়াং” এবং “রোয়াং” হতে “রোহিঙ্গা” শব্দের আবির্ভাব।

তৎকালীন আরাকানের রাজা মহৎ ইং চন্দ্রের সুন্দর ব্যবহার ও আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। স্থানীয় রমণীদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাঁরা আরকানের নাগরিক হিসেবে সেখানকার আর্ত-সামাজিক উন্নয়নের অংশিদার হন।
প্রখ্যাত আরব ভৌগোলিক সোলায়মান ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর “সিলসিয়াত উত তাওয়ারিখ” গ্রন্থে “রোহমী” নামক একটি দেশের পরিচয় দিয়েছেন যার অবস্থান বঙ্গোপসাগরের তীরে। ধারণা করা হয় এটাই আরাকান বা রোসাঙ্গ।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পূর্বে রোহিঙ্গা নেতারা স্বাধীনতার দাবিতে অগ্রগামী ছিলেন। “অল বার্মা স্টুডেন্টস ফোরাম” নামের যে সংগঠন স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলো তার সভাপতিও ছিলেন একজন মুসলিম রোহিঙ্গা এবং সেক্রেটারি ছিলেন সুচির প্রয়াত বাবা অং সান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বেশ ভালই চলছিল রোহিঙ্গাদের জীবন। মায়ানমারের জাতীয় সংসদেও রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। রাষ্ট্রীয় উচ্চপদেও অধিষ্ঠিত ছিল রোহিঙ্গা প্রতিনিধিগণ। বিপত্তি ঘটে ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইনের সামরিক শাসন ঘোষণার পর। পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের অধিকার সংকোচিত হয়ে আসেঃ

* হাজার বছর ধরে মায়ানমারে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরকে বিদেশী বাঙালি অবিহিত করা হয়।
* নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়।
* নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়।
* ইরাবতী অববাহিকায় সমৃদ্ধ রোহিঙ্গা কৃষকদের ভূমি মালিকানা পর্যায়ক্রমে রদ করা হয়।

উগ্র প্রশাসন মনে করে রোহিঙ্গারা নাকি বাংলাদেশী! কি আশ্চর্যজনক দাবি! অথচ মায়ানমারে জনবসতি স্থাপন হওয়ার কিছুকাল পর হতেই তারা এখানে বসবাস করে আসছে। প্রাচীন জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণরূপে নির্মূলের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের উপর চালানো হয় ভয়াবহ দমন অভিযান। তাদেরকে বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করে বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গা রাজ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক নিধনযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে। ১৯৭৯, ৯২, ২০১২, ১৫ এবং ১৬ সালে সংঘটিত ভয়াবহ দাঙ্গার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ২০১৭ সালের দাঙ্গা। ২৫ আগষ্ট ২০১৭ তারিখ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্তচৌকিতে কথিত ‘রোহিঙ্গা জঙ্গিদের’ হামলার জের ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ কমপক্ষে ৮৯ জন নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ১২। অং সান সুচির দপ্তর হতে অন্য ৭৭ জনকে ‘জঙ্গি’ বলে দাবি করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ও শুক্রবার ভোরে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এই রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কথিত মুসলিম বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এই ইস্যুতে “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” নামে মায়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধভিক্ষুদের সমন্বয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কমপক্ষে ২০টি তল্লাশিচৌকিতে এই হামলায় নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে সহস্রাধীক মানুষ নিহত হয়েছে।

এর আগে গত বছরের অক্টোবরে রাখাইনের সীমান্তচৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার পর সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক নিধনযজ্ঞ শুরু করে। ওই ঘটনার জের ধরে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা দেশত্যাগ করেছে।
রাখাইনের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহস্পতিবার আনান কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যে ৮৮টি সুপারিশ করেছে, তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

বোদ্ধা মহলের ধারণা,- এমন নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কোন দূরভিসন্ধি থাকতে পারে।
: “তুমি কী চিন্তিত? এজন্যই তোমাকে বলেছিলাম,-মংডু যাওয়া তোমার জন্য নিরাপদ হবে না।” মেয়াও চু’কে হালকা ধাক্কা দিয়ে সোয়ে সান।
: “দুশ্চিন্তা নয়! ভাবছিলাম।”
: “কী ভাবছিলে?”
: “একটি সমৃদ্ধ জাতিসত্তা কিভাবে বিলুপ্ত হয়! কোন জাতি যদি ভুলে যায় তার সোনালি অতীত, তবে সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য।”
: “ঠিকই বলেছো। আত্মভোলা জাতি উর্দ্ধগামী সিঁড়ির যাত্রী না হয়ে নিম্নগামী সিঁড়ির যাত্রী হয়।”
: “নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরকেই গড়ে নিতে হয়। অন্য কেউ ভাগ্যের দরজা খোলে দেয় না।”
: “হাজার বছর ধরে আরকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সরকার বিদেশী অনুপ্রবেশকারী বাঙালি আখ্যায়িত করছে। চরম হাস্যকর।”
: “সেনা প্রধানের গতকালের বিবৃতি পড়েছো?”
: “হুম। পড়েছি। সেনাপ্রধান মিন অং লায়েং তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন,- “সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা উগ্রপন্থী বাঙালি সন্ত্রাসীদের একসঙ্গে মোকাবিলা করেছ।”
: “কী হাস্যকর স্ট্যাটাস দেখো!”
: “আসলে কালো চামড়া আর বাংলা ভাষা তাদের সহ্য হচ্ছে না।”
: “ঠিক বলেছো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম বাঙালি অধ্যুষিত। কিন্তু সেখানকার সরকার কখনো বলেনি যে, তারা বাংলাদেশী!”
: “ভাষার সাথে নাগরিকত্বের কী সম্পর্ক! সম্পর্ক থাকলে তো অনেক ভারতীয় পাকিস্তানের নাগরিক। কারণ ভারতে উর্দুতে কথা বলে এমন লোকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়।”
গল্প যেন আর থামে না। গভীর রাতে গল্পের তালে সোয়ে সান যে কখন ঘুমিয়ে পড়ছে নিজেই জানে না। বাসের ইনডোর লাইট নিভানো। বার্মিজ ভাষায় জনপ্রিয় গানের সাথে হালকা মিউজিক চলছে। রাস্তায় ট্রাফিক নেই বললেই চলে। যেন গভীর রজনীর নিস্তব্ধতা ভেঙে ফ্রি রোডে ছুটে চলছে দানবাকৃতির বাস। মেয়াও চু পরম যত্নে বাস কর্তৃপক্ষের দেওয়া হালকা কম্বলটি দিয়ে সোয়ে সানের দেহ আবৃত করে দিলো।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মেয়াও চু’ও এক সময় ঘুমের কোলে ঢলে পড়লো।
হঠাৎ হার্ড ব্রেকে গাড়ির ঝাঁকুনীতে মেয়াও চু’র ঘুম ছুটে গেলো। গাড়ি থামার কারণ জানতে চাওয়ার পূর্বেই দেখলো অবাক কাণ্ড। ঘমন্ত সোয়ে সানের মাথা অসতর্কাবস্থায় তার কোলে ঢলে পড়েছে। এয়ার কন্ডিশনের শীতল তাপমাত্রা হতে মুখাবয়ব বাঁচানোর জন্য অবচেতন সোয়ে সান মেয়াও চুর উরুসন্ধিতে মুখ গুজে আছে। মেয়াও চু’র ডানহাত সর্পাকারে সোয়ে সানের কোমর জড়ানো। অতি সতর্কতার সাথে হাতটি ফিরে এলো। কিন্তু হাত রাখার সুবিধাজনক কোন প্লেস মেনটেইন করতে না পেরে সোয়ে সানের সোনালি চুলের শেষ প্রান্তে ঘাড়ের উপর রাখলো। মেয়াও চু স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে সোয়ে সানের গরম নিঃশ্বাস। জাগানোর উদ্দেশ্যে ঘাড়ের উপর হাত দিয়ে আস্তে একটা নাড়া দিলো। অঘোর ঘুমের ঘোরে আদুরে স্পর্শে সোয়ে সান মেয়াও চু’র দুই রান দু’হাতে শক্তভাবে প্যাঁচিয়ে ধরেছে।

যৌবনের আকাশচুম্বি উত্থান টের পাওয়া যাচ্ছে। সোয়ে সানের সরু গোলাপী ঠোঁটের কোমল স্পর্শ অনুভূতির সাগরে প্রবল জোয়ার নিয়ে আসছে। নারীস্পর্শ অগ্নিছোঁয়া চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছে মেয়াও চু’র ভার্জিন পৌরুষত্বে। যৌবনের জোয়ার নীতি-নৈতিকতার বাধা মানতে চায় না। যৌনতা প্রশ্নে চির ঘুমন্ত মানবিক বিবেককে জাগিয়ে দিতে হয়। অন্যতায় আবেগের দুর্দান্ত ঝড়োগতি বিজয়ী বেশে যৌবনকে গ্রাস করে। নির্লিপ্ত বিবেকের কাঠগড়ায় আবেগ সর্বদা স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করে।

হঠাৎ গাড়িতে ইনডোর লাইট জ্বলে উঠলো। সাথে সাথে কয়েক জোড়া বুটের ঠক ঠক শব্দ শুনে মেয়াও চু মাথা উঁচু করে দেখলো কয়েকজন সেনা সদস্য ফাইটিং পজিশনে গাড়িতে উঠছে।
মেয়াও চু সোয়ে সানকে জোরে একটা ঝাঁকুনী দিয়ে বললো,-“এই! দ্রুত ওঠো!”
ধড়ফড় করে ওঠে পড়লো সোয়ে সান। হঠাৎ মেয়াও চু’র মতো গভীরভাবে উপলদ্ধি করতে না পারলেও বেশ বুঝতে পারলো যে, এতক্ষণ তার ঠোঁট, নাক, মুখ কোথায় ছিলো!

মনে মনে লজ্জা পেলেও গাড়ির ভিতরের পরিস্থিতি দেখে সব ভুলে গেছে।
বর্বর মায়ানমার সেনারা প্রত্যেক যাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং সাথে থাকা লাগেজ তল্লাশি করছে। মেয়াওদের “সি-৩, ৪” সিটের কাছে এসে দাঁড়ালেন একজন ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার অফিসার। নেমপ্লেটে স্পষ্ট বার্মিজ বর্ণমালায় লেখা ক্যাপ্টেন গৌতম।
: “আপনাদের পরিচয় বলুন।” উগ্র কণ্ঠে সামরিক অফিসার।
: “আমি মেয়াও চু। ও সোয়ে সোয়ে সান। দু’জনই ডাগন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি।”
: “কোথায় যাবেন? কেন যাবেন? উনি আপনার কী হন?”
: “মংডুতে ওর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছি। ও আমার বন্ধু সোয়ে সোয়ে সান।”
: “রাখাইনে অনুপ্রবেশকারী বাঙালি সন্ত্রাসীরা দেশে ভয়ানক অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে। সেখানে আপনারা বেড়াতে যাচ্ছেন!”

ক্যাপ্টেন বদমেজাজী গলায় বিদ্রুপ করছে আর সোয়ে সানের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সোয়ে সানের টি-শার্ট ভেদ করে বের হয়ে আসা উঁচু জোড়া পাহাড়ের দিকে কুৎসিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ক্যাপ্টেন বললো,-
: “আপনাদের সন্দেহ হচ্ছে। দু’জনই বাঙালি কালার। নিচে নেমে আসুন।”

চেক পোস্টের ভিতরে নিয়ে এসে উপর্যুপরি প্রশ্ন করতে লাগলো ক্যাপ্টেন গৌতম,-
: “বাঙালি কালারের কেউ মায়ানমারের নাগরিক হওয়ার কথা নয়।”
: “বাঙালির চুলের কালার সোনালি হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া আমাদের দু’জনের স্টুডেন্ট আইডি কার্ড আমরা আপনার নিকট শো করেছি।” মেয়াও চু’র জবাব।
: “তাও আপনাদের তল্লাশি করতে হবে।”
দু’জন সৈনিককে মেয়াও চু’র দেহ তল্লাশি করার নির্দেশ দিয়ে বললো,-
“এই মেয়েকে আমার সন্দেহ বেশি হচ্ছে। ওর দেহ আমি নিজে তল্লাশি করবো।”
: “নো! ইটস কোয়াইট ইম্পসিবল” মেয়াও চু’র বজ্রধ্বনি।
: “রাবিশ! স্টপ ইউর মাউথ। ক্যাপ্টেন গৌতমের সিদ্ধান্ত কখনো পরিবর্তিত হয় না। সুন্দরী নারীকে একা ভোগ করবে করো, কিন্তু আমাকে একটু উষ্ণ ছোঁয়া হলেও দিয়ে যাও! রাগ করে লাভ নেই। বরং উপভোগের বিষয় উপভোগ করো। আমিও মজা পাবো, তোমার সাথে আমার ফোর্সও মজা পাবে। কর্মস্পৃহা বেড়ে যাবে—”
ভয়ে সোয়ে সানের চেহারা রক্তশূণ্য হয়ে গেছে।
রাগে-ক্ষোভে অগ্নিলাল মেয়াও চু,-“হারামজাদা! তোর কী মা-বোন নেই!”
: ” এতো মরদ দেখাচ্ছিস কেন? ভাবছিলাম শুধু মাপ নেবো! এখন দেখছি পুকুরের গভীরতাও পরখ করতে হবে। সবাই মা-বোন হলে গার্লফ্রেন্ড কে হবে? মাস্তি করবো কার সাথে?”
অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো ক্যাপ্টেন গৌতম। শেষ রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করা হাসির সুরে নোংরামীর বাদ্য বেজে উঠছে।

গাড়ির হর্ণের শব্দ শুনে পিছনে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন নিজেকে সংযত করলো। পিচঢালা শক্ত কনক্রিটের রাস্তায় পা ঠুকে লম্বা স্যালুট করলো।
সামরিক জিপ হতে মেজর পদ পর্যাদার একজন সামরিক কর্তা বের হয়ে আসলেন।
: “কী ব্যাপার? এখানে কী হয়েছে? এতো হাসাহাসি কেন?”
: “দু’জন সন্দেহভাজনকে চেক করছিলাম স্যার।”
: “কই দেখি?”
ক্যাপ্টেন গৌতম ইঙ্গিতে মেয়াও চু এবং সোয়ে সোয়ে সানকে দেখালো।
মেয়াওকে দেখে নবাগত মেজর উথ্যাই চমকে উঠলেন! এতো আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অধ্যাপক ডাঃ ওয়াং চু’র ছোট ভাই মেয়াও চু!
: “আরে মেয়াও! তুমি এখানে কেন? কোথায় যাচ্ছো?” মেয়াও’র দিকে হাত বাড়িয়ে মেজর উথ্যাই।
: “আমার বন্ধু সোয়ে সোয়ে সানের মংডুর বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছি। ও সোয়ে সান। মংডু চেম্বার অব কমার্সের বর্তমান প্রেসিডেন্টের একমাত্র মেয়ে। আমার সাথে ডাগনে পড়ে।”
মেজর উথ্যাই সোয়ে সানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। সোয়ে সান ভীত হরিণীর মতো কোমল হাতটি এগিয়ে দিলো। ইতিমধ্যে জলপাই রঙের পোষাকের প্রতি ঘৃণার কারণে মনে যে ভয় ঢুকেছে তা এখনো কাটেনি। এখনও ভয়ে কুঁকড়ে আছে।
: “এদেরকে চেনো?” ক্যাপ্টেন গৌতমকে লক্ষ্য করে মেজর উথ্যাই।
: “স্যার! নো স্যার!”
: “সমগ্র মায়ানমারে পরিচিত ও সমাদৃত চু পরিবারের ছেলে মেয়াও চু আর মংডুর চেম্বার সভাপতিকে তো তোমার ভালো চেনার কথা!”
: “স্যার! ইয়েস স্যার! সরি স্যার।”
: “কারো সম্পর্কে না জেনে আন্দাজে কথা বলবে না।”
: “স্যার! রাইট স্যার!”
মেজর উথ্যাই মেয়াওকে এমন পরিস্থিতিতে মংডু সফরের সিদ্ধান্তকে অদূরদর্শী আখ্যায়িত করে বললেন,-“কী দরকার ছিলো এমন নাজুক পরিবেশে মংডু ভ্রমণ করার! সরকার হার্ড লাইনে। হঠাৎ কোন আঘটন ঘটে গেলে কী হবে। যাক, চলেই যখন এসেছো বেশিদিন থেকো না। দ্রুত ব্যাক করিও।”
মেজর উথ্যাই মেয়াওদের বাসে উঠতে বলে গ্রিন সিগন্যাল দিলো। বাসের চাকা আবারও সচল। গন্তব্য অতি সন্নিকটে। মংডুর প্রবেশপথে তল্লাশি নামের মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হয়ে ভীষণ বিধ্বস্ত বাসের সকল যাত্রী। অবশিষ্ট মাত্র ছয় কিলোমিটার রাস্তা যাত্রীদের কাছে ছয় হাজার কিলোমিটার দূরের পথ মনে হচ্ছে।

পর্ব-চার লিংক:-

আরকানি ফুল (পর্ব-০৪): মুহাম্মদ ইয়াকুব

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.