মুহাম্মদ ইয়াকুব

পর্ব-২

পরের দিন সকাল নয়টা। ১১ ঘন্টা পর ইস্ট-ওয়েস্ট তেরামী হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ভিভিআইপি কেবিনে প্রবেশ করলো মেয়াও চু। গতরাত ১০টার সময় সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্বস্ত হয়ে বাসায় ফিরেছিলো। এর মধ্যে দ্বিতীয় বারের মতো কোন আলাপ করার সুযোগ হয়নি। এমনকি তরুণীর নামটাও জানার সুযোগ হয়নি! ডাঃ ওয়াং এর পারিবারিক রোগী হওয়ার সুবাধে ভিভিআইপি মর্যাদায় সকল প্রকারের সুবিধা ভোগ করছে তরুণী।
কেবিনে প্রবেশ করে মেয়াও চু একটু হতবিহ্বল হলো। তিনজন আগন্তুক সোফায় বসে আছে। দুজন প্রৌঢ় নারী-পুরুষ, অপরজন তার সমবয়সী যুবক। মেয়াও চু’র প্রবেশের সাথে সাথে তরুণী ওঠে বসলো। ইতোমধ্যে পোষাক পরিবর্তন করে গোলাপী রঙের গাউন পরিধান করেছে। মনে হলো, গোলাপের পাঁপড়ি মোড়ানো আরেকটি তাঁজা গোলাপ। গতকালের চেয়ে আজ আরো বেশি সুন্দরী ও আবেদনময়ী মনে হচ্ছে। বিন্যস্ত সোনালি চুলের বাহার যেন সোনালি চাদরের ভাঁজ।
হাস্যোজ্জ্বল তরুণী মেয়াও চু’কে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলোঃ
“উনি মেয়াও চু। ইয়াঙ্গুনের বিখ্যাত চু গ্রুপ অব কোম্পানীর মালিক অনু চু’র কনিষ্ঠ সন্তান। ইয়াঙ্গুনের ডাগন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চূড়ান্ত বর্ষের তুখোড় মেধাবী শিক্ষার্থী।তিনিই গতকাল আমার জীবন রক্ষায় প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করেছেন।”তিনজনই ওঠে দাঁড়িয়ে মেয়াও চু’কে অভ্যর্থনা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন।বয়স্ক পুরুষ ভদ্রলোক বললেন,-
“আপনার বাবার সাথে ব্যবসায়ীক কারণে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। তার চেয়েও বড় কথা হলো আমরা উভয় পরিবারই মায়ানমারের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয় পরিবারের উত্তরাধিকারী। আমি সিমান সান। পাইয়ূ জনগোষ্ঠীর সান বংশের উত্তরাধিকারী। মংডু চেম্বার অব কমার্সের প্রসিডেন্টের দায়িত্বে আছি। আপনার বাবা অনু চু মন জনগোষ্ঠীর সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হিসেবে সামাজিকভাবে সমাদৃত।
আমার একমাত্র মেয়ে সোয়ে সোয়ে সানের জীবন রক্ষার জন্য আমরা আপনার নিকট কৃতজ্ঞ। একমাত্র মেয়ের দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া মাত্র সোয়ের মা কিয়াও ও ভাই পিদাও সানকে নিয়ে ইয়াঙ্গুনে ছুটে এসেছি।”
সিমন সানের বক্তব্য শেষ হতেই কিয়াও এবং পিদাও সান হাত ও মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন।
কিয়াও আবেগঘন গলায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললেন,- “গতরাতে মংডুতে বড় একটি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। সামরিক বাহিনী মংডু শহরে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না, আবার বেরও হতে দিচ্ছে না। মেয়ের এমন দুঃসংবাদ পেয়ে ওর বাবা সামরিক বাহিনীর হাই কমান্ডের সাথে যোগাযোগ করে অনেক প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে চলে এসেছে। বৌদ্ধ তোমার মঙ্গল করুন বাবা।”
দীর্ঘ বক্তব্য শ্রবণের পর মেয়াও চু লাজুক গলায়ঃ “দেখুন! আপনারা আমার বাবা-মায়ের বয়সী। আন্টি আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করলেও আঙ্কেল আপনি করে বলছেন। এটা আমার জন্য লজ্জার। আর আমি কিছুই করিনি। সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার মালিক একজনই। আমি শুধু সহায়তা করেছি মাত্র। মানুষের বিপদে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া পবিত্র দায়িত্ব।”
সোয়ে সানের বাবা সিমান সান মেয়াও চু’র মাথায় হাত রেখে দোয়া করে বললেন,-
“তোমার মতো সোনালি যুবকেরা বেঁচে থাকুক অনন্তকাল ধরে। তোমরা গল্প করো আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি। না আসা পর্যন্ত যাবে না কিন্তু।”

মেয়াও চু এতক্ষণ পরে জানতে পারলো তরুণীর নাম সোয়ে সোয়ে সান। মেয়াও তড়িৎ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। সোয়ের বাবা, মা ও ভাই’র দরজার অন্তরালে অন্তরীন হওয়া নীরবে দেখলো।
কেবিনে পিনপতন নীরবতা। দু’জনই নীরব। দৃষ্টি নিম্নগামী। লজ্জা আর আড়ষ্টতা ঝেঁকে বসেছে যৌবনের ভরদুপুরে অবস্থান করা মেয়াও চু এবং সোয়ে সোয়ে সানকে। পাশে কেউ থাকার পরও নীরবতা অসহ্য। তবে এই নীরবতায় যেন উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ ভর করেছে! উভয়েই নীরব থাকতেই স্বস্তিবোধ করছে।
নীরবতার মহাকাল ভেদ করে প্রতিধ্বনিত হলো,-“সরি”।
মেয়াও চু চাতকের মতো মস্তক উঁচু করে দেখলো, সোয়ে সোয়ে সান মুখ নিচু রেখে আড়চোখে তার প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করে বলছে,-“সরি”।
: “কেন ম্যাম? সরি হওয়ার কী হলো?”
: “আসলে—- আসলে —–”
বার বার আড়ষ্টতায় সোয়ে সোয়ে সানের কথা আটকে যাচ্ছে।
: “আসলে আমি আসায় আপনি সীমাহীন অস্বস্তি ফিল করছেন। এই তো!”
: “না না। তা নয়।”
: “তাইলে?”
: “গতকাল সম্পূর্ণ দোষ আমার ছিলো। আমি রাগের মাথায় অযাচিত কথা বলেছি। না বুঝে আপনার সাথে অসভ্য আচরণ করেছি।” বিনীত কণ্ঠে সোয়ে সোয়ে সান।
: “দেখুন, এখানে মূলত আপনারও কোন দোষ নেই! এটি একটি মানবিক দুর্বলতা। মানুষ পরাজয় মানে না, মানতে চায় না।”
: “এজন্যই সরি”।
: “ইট’স ওকে। বাট আপনি আমার নাম-ঠিকানা জানলেন কিভাবে?”
: “আপনিই বলেছেন”। গালে টোল পড়া সুমিষ্ট হাসিমাখা মুখে সৌন্দর্যের সর্বোত্তম উপমা সোয়ে সানের জবাব।
: “এ্যাঁ!কখন বললাম? জোকস করছেন?” বিস্মিত সোয়ে সান।
: “দুর্ঘটনাস্থলে আপনার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে রাগে বকবক করতে করতে প্রস্থান করেছিলেন। তখন রাগের মাথায় আমিও কার্ডটি দেখিনি। কার্ডটি অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা হিসেবে পার্লসে ঠিকানা করে নিয়েছিলো। হাসপাতালে এসে দেখলাম আপনার প্রতি সবার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তারপর আপনার সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ প্রবল হয়। প্রথমে ভিজিটিং কার্ডে নামের শেষে চু দেখে প্রাথমিক ধারণা পেলাম। বংশের পরিচয় ও একাডেমিক পরিচয় কার্ড হতেই পেলাম। এরপরও কেন যেন জানার পরিধি বৃদ্ধির তৃষ্ণা বেড়ে গেলো। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান ডাঃ মিনুচিং মংডু শহরে আমাদের প্রতিবেশী। গতরাতে তিনি ভিজিটিংএ আসলে তাঁর কাছ হতে বিস্তারিত জেনে নিয়েছিলাম।”
: “এমনভাবে বলছেন যেন রূপকথার কোন রাজকুমারের পরিচয় জানাছেন। প্লিজ এভাবে বলবেন না। আপনিই বরং রূপকথার রাজকুমারী। মায়ানমারের প্রাচীন যে কয়টি জনগোষ্ঠী এখনো স্বমহিমায় উদ্ভাসিত, তাদের মধ্যে আপনাদের পাইয়ূ জনগোষ্ঠী ও আমাদের মন জনগোষ্ঠী প্রধান। প্রাচীনকাল হতে পাইয়ূ জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে আপনাদের সান পরিবার। মায়ানমারের রাষ্ট্রযন্ত্র যখনই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের ভয়াবহতা বাড়ায়, তখনই সম্ভ্রান্ত বৌদ্ধগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও পাইয়ূ গোষ্ঠীর নেতারা প্রতিবাদ করেন। সাম্প্রদায়িকতামুক্ত স্বপ্নের মায়ানমার বিনির্মানে আপনাদের প্রয়াস শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ সমাজের বোদ্ধা মহলে প্রশংসিত।
: “আপনাদের জনগোষ্ঠীও আমাদের মতো সর্বদা মজলুম মানবতার পক্ষে অবস্থান করে। আপনারা মায়ানমারে অধিক পরিচিত ও সম্মানিত। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতারা মায়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃস্থানীয় ছিলেন। ৪৭-৪৮এ ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে আমাদের দুই জনগোষ্ঠীর অবদানও অসামান্য। আপনার সাথে পরিচিত হতে পেরে সত্যি আমি গর্বিত।”
: “আপনার বিনয়ের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। থাক সে প্রসঙ্গ। অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি কী করেন? এখানে কোথায় থাকেন?”
: “আমি ডাগন বিশ্ববিদ্যালয় হতে এবার ফিজিক্সে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি। ইয়ানকিন আবাসিক এলাকার পাশে আপনাদের একটি প্রতিষ্ঠান আছে। মে চু এমব্রয়টারি। মে চু এমব্রয়টারির সোজা পিছনে সবুজ রঙের একটি তিন তলা ভবন আছে। ভবনটি আমার খালার। এর দ্বিতীয় তলায় এক ফ্ল্যাটে উনারা থাকেন, অন্য ফ্ল্যাটে আমি থাকি একা। প্রায় সময় বাবা বাণিজ্যিক কাজে ইয়াঙ্গুন আসলে তিনিও এখানে উঠেন।”
: “ও। বেশ ভালো। আপনার বাসায় খেতে যেতে হবে। নিশ্চয় আপনার হাতের রান্না অনেক সুস্বাধু হবে!”
: “ওহ। সরি। অনেক্ষণ ধরে কথা হচ্ছে। আপ্যায়নের কথা একদমই ভুলে গেছি! কী খাবেন বলুন।”
: “বাসা হতে খেয়ে বের হয়েছি। এখন কিছু খাবো না। চা বা কফি চলতে পারে।”
সোয়ে সান ইন্টারকমে কফির আর্ডার করলো। প্রায় সাথে সাথেই বেজে উঠলো কেবিনের কলিংবেইল।
দরজার অপর প্রান্ত হতে খাঁটি বার্মিজ উচ্চারণে,-
: “ম্যাডাম আসতে পারি?”
: “কে বলছেন প্লিজ!”
: “আমি হাসপাতালের এডমিন অফিসার।”
: “ওকে। আসুন।”
: “আপনি এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী আজ বিকেলে আপনাকে ছাড়পত্র প্রদান করা হবে।”
: “আচ্ছা। দয়া করে বিলটা পাঠিয়ে দিবেন।”
: “বিল দিতে হবে না ম্যাম। বিল পরিশোধ হয়ে গেছে।”
: “বলেন কি! কখন? বাবা তো কিছু বললেন না!”
: “সকল প্রকার বিল ডাইরেক্টর স্যার পরিশোধ করেছেন। ধন্যবাদ ম্যাম।”
কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানিয়ে হাসপাতালের এডমিন অফিসার প্রস্থান করলো।
: “কাজটা ভালো হয়নি।” মেয়াও চু’কে লক্ষ্য করে সোয়ে সান।
: “কেন?”
: “কেন মানে? রোগী আমি, বিল পরিশোধ করলো আপনার ভাই!”
: “আরে সমস্যা নেই। আমার ভাই ঐ কাজ আগেই সেরে ফেলেছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।” দুষ্টুমির হাসি হেসে বললো মেয়াও চু।
: “কোন কাজের কথা বলছেন!” বুঝতে না পেরে সোয়ে সানের জিজ্ঞাসা।
: “আমার ভাই আরো এক বছর পূর্বেই বিয়ের কাজ সেরে ফেলেছেন।”
মেয়াও চু শব্দ করে হেসে উঠলো।
: “আপনাকে এতক্ষণ ধরে ভদ্র ভেবে আসছি। কিন্তু এখন দেখছি—–” কিছুটা রেগে গেছে সোয়ে সান।
: “এখন কি ভাবছেন? বদমায়েশ!” চোখের ভ্রু নাচিয়ে কৌতুকের স্বরে বললো মেয়াও চু।
: “পুরোপুরি বদমায়েশ না হলেও মোটামুটি বদমায়েশই! আর আপনি কিভাবে ভাবতে পারলেন আপনার বুড়ো ভাইকে আমি বিয়ে করার চিন্তা করবো!”
: “জোকস করলাম ম্যাম। পরিবেশটা কেমন যেন গম্ভীর গম্ভীর মনে হচ্ছিলো। হাসপাতালে সুস্থ লোক থাকলেও অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরিবেশটা হালকা করার জন্য দুষ্টুমি করলাম। কিছু মনে করবেন না প্লিজ।”
: “ওহ! তাই! নো প্রবলেম। ইটস ওকে।”
: “তাছাড়া ভাই মনে করেছে আপনি আমার প্রাণের কেউ। মানে আপনার সাথে আমার হৃদয়ঘটিত কোন রিলেশন আছে। বাড়িতে ভাবির কাছে সেভাবেই বলেছে।”
: “আশ্চর্য! এমনটা মনে করার কারণ কি! আপনি তো আমার শত্রু ছিলেন!”
: “হা হা হা! আমি আপনার শত্রু কখন ছিলাম? গত রাতে বাসায় যাওয়ার পর ভাবি বলেছিলেন-‘কী ব্যাপার নায়ক সাহেব! নায়িকার কী অবস্থা? তুমি নাকি কোন নায়িকাকে ফিল্ম স্টাইলে হাসপাতালে নিয়ে গেছো!’ ভাবির এই কথা শুনে আমি বলঝতে পেরেছিলাম সব ভাইয়ার অমূলক ধারণা।”
: “ওহ! কী আজব চিন্তা!”
: “যাই হোক, এমনটা ভাবতেই পারে। এটি কোন ব্যাপার না। মূল ঘটনা তো আমরা জানিই।”
: “আচ্ছা টাকাটা আপনাকে পেইড করে দেবো। করুণা গ্রহণ করার অভ্যাস বংশগতভাবে নেই।”
: “আহ! আপনি ভুল বুঝবেন না প্লিজ! এখানে করুণার কোন ব্যাপার নেই। নিছক সৌজন্যতা মনে করতে পারেন। আর যদি ফেরত দিতে চান তবে আপনার প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণার সৃষ্টি হবে।” কাতর কণ্ঠে মেয়াও চু।
মেয়াও চু’র আবেগঘন কথা শুনে সোয়ে সান বিহ্বল হয়ে গেছে। বোবাদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রায় ছয় ফিট লম্বা উজ্জল শ্যামবর্ণের যুবক মেয়াও চু’র দিকে। ভাবছে, টাকা দিতে চেয়ে অন্যায় করেছে। যুবকটির দৃষ্টিতে পবিত্রতা উতরে পড়ছে।

পর্ব-০১ এর লিংকঃ-

উপন্যাস আরকানি ফুল: মুহাম্মদ ইয়াকুব -(পর্ব-এক)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.