স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মার্চ মাসে বাঙালি জাতিকে শুনিয়েছিলেন এক মহাকাব্য। সেই মহাকাব্য ছিলো মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণার উৎস। যেটা থেকে সৃষ্টি হয়েছে আরো বহু কাব্য। এসব কবিতায় জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব প্রেক্ষাপট দেখা যায়।

বঙ্গবন্ধু কবিদের ভালোবাসতেন, কবিরাও ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধুকে। এসব ভালোবাসাবাসির উপাখ্যান বর্ণণা করলে সহজে শেষ হবে না। কারণ, এই ইতিহাস অনেক বিস্তৃত ও গৌরবগাঁথা। তার চেয়ে বরং বঙ্গবন্ধুর একটি কবিতা নিয়েই আলোচনা করি! হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুর একটি অনবদ্য কবিতা – ভাষণকাব্য। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের সেই জ্বালাময়ী ভাষণকাব্য। এই কবিতা নিয়েও বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে নবীন-প্রবীন মিলিয়ে সহস্রাধিক কবির কবিতা।

তার মধ্যে অলঙ্কার, শিল্পগুণ ও ভাব বিচারে সবচেয়ে সার্থক দুটি কবিতা : নির্মলেন্দু গুণের “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো” এবং আল মাহমুদের “নিশি ডাক”।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানমুখি প্রবল জনস্রােত। জনতার উত্থাল মহাসমুদ্রে তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ঢেউয়ের মাঝে ভাষণ দিচ্ছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তৎকালীন পেশায় সাংবাদিক কবি নির্মলেন্দু গুণ পেশাগত কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণটি মঞ্চের সামনে থেকে শ্রবণ করার সুযোগ পান। রেসকোর্সে শুনা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি কবি নির্মলেন্দু গুণের কাছে মনে হয়েছে, এটি একটি কবিতা। কারণ বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কাব্যসমৃদ্ধ ছিলো।

এমনকি পরবর্তী সময়ে মার্কিন সাপ্তাহিক “টাইমস” পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর “পয়েট অব পলিটিকস” শিরোনামে একটি প্রচ্ছদ স্টোরি করেছিল। মার্কিনরাও ঐতিহাসিক সেই ভাষণ স্টাডি করে তার মধ্যে কবিতার সন্ধান পেয়েছিল। পাবে না-ইবা কেন! এই ভাষণে রেসকোর্সে সমবেত ১০ লাখ মানুষ একসঙ্গে লাফিয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিলো, নজরুলের মতো কোন শক্তিমান কবি নতুন কোন “বিদ্রোহী” আবৃত্তি করছিলো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেই শক্তিশালী ভাষণকাব্যের স্মৃতি অবলম্বনে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখে ফেললেন, “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো”।

নির্মলেন্দু গুণের “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো” কবিতাটি বুঝতে খুব বেশি কবিতা সমঝদার হবার প্রয়োজন হয় না। ভাষাকাঠিন্য পরিহার করে সহজবোধ্য ভাষায় সাবলিল উপস্থাপনের কারণে কবিতাটি সর্বসাধারণের জন্য খুব সহজেই বোধগম্য। আবার সর্বসাধারণের বোধগম্য হবার কারণে কবিতার শিল্পগুণ, ভাব, আবেদন কোনটাই কমেনি। বরং সহজবোধ্যতার কারণে এটি বাংলাদেশের গণমানুষের কবিতা হয়ে উঠেছে।

এই কবিতার প্রতিটি বাক্যেই গৌরবের শিহরণ খেলে যায়, প্রেরণার বাতিঘর দেখায়। রেসকোর্সে অপেক্ষমান জনতা বঙ্গবন্ধুর ভাষণকাব্য শোনার জন্য কী আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে বসে আছে তা বর্ণিত হয়েছে, “একটি কবিতা লেখা হবে/তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে/লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে-/‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’’ ইতিহাস বিকৃতির ঘটনা এদেশে নতুন নয়।

সেই গণসমুদ্রের কথা ইতিহাস হতে মুছে দেবার অনেক আয়োজন হয়েছিলো, “জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে/হয়েছে উদ্যত কালো হাত।” কিন্তু তা মুছে দেওয়া কোনক্রমেই সম্ভব হবে না। অনাগত দিনের কবিদের উদ্দেশ্যে নির্মলেন্দু গুণ লিখে গেলেন ৭ মার্চের ঐতিহাসিক দলিল, “হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি/শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি/একদিন সব জানতে পারবে,- আমি তোমাদের কথা ভেবে/লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।” সেদিন স্বাধীনতাকামী জনতার মহাস্রােতে গোটা রেসকোর্স ছিলো প্রাণচঞ্চল, “আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশে ছিল/এই ধু-ধু মাঠের সবুজে।”

“কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক, লাঙল জোয়াল কাঁধে/এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক, পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে/এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক, হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে/এসেছিল মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা/ভবঘুরে আর তোমাদের মতো শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে” রেসকোর্স ময়দানে ছুটে এসেছিলো একটি কবিতা শুনার জন্য। সবাই উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিলো কাঙ্ক্ষিত কবির জন্য। “শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।” কবির আগমনে জনতাসাগর দুলে উঠলো।

অপ্রতিরোধ্য বজ্রকণ্ঠ বেজে উঠলো, “জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা/কে রোধে তাঁহার বজ্র কণ্ঠ বাণী?” রেসকোর্স প্রকম্পিত করে অপেক্ষমান ১০ লাখ শ্রোতার উদ্দেশ্যে কবি তাঁর অমর কবিতাটি শুনিয়ে দিলেন, “গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শুনলেন তাঁর/অমর কবিতাখানি/‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এভাবেই এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। তখন হতেই স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হয়ে গেলো। কবি নির্মলেন্দু গুণ এমন অসাধারণ চিত্রকল্পে এঁকেছেন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকাব্যটি।

কবি আল মাহমুদ তাঁর “নিশি ডাক” কবিতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকাব্যটি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন সেটি খুবই উচ্চমার্গীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। “নিশি ডাক” কবিতার কোথাও সরাসরি বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা, ৭ মার্চ এসব শব্দের উল্লেখ নাই। কবিতা সমঝদার ব্যতীত অন্য কেউ খুব সহজে কবিতাটি বুঝতে পারবে না – এটি যেমন সত্য, ঠিক তেমন সামান্য ইঙ্গিত দিলে অন্ধও স্বাচ্ছন্দে আস্বাদন করতে পারবে কবিতার গভীরে লুকিয়ে থাকা অমৃত স্বাদ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসংখ্য খ্যাতিমান, কম খ্যাতিমান বা অখ্যাত কবি সহস্রাধীক কবিতা লিখলেও আল মাহমুদ মাত্র একটি কবিতা লিখেছেন। বিনাদ্বিধায় বলা যায়, শিল্পের বিবেচনায় এই একটা কবিতাই সহস্র কবিতার সমান।

আল মাহমুদ বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে উপস্থাপন করেছেন, “সে যখন ডাকল ‘ভাইয়েরা আমার’/ভেঙ্গে যাওয়া পাখির ঝাঁক ভিড় করে নেমে এলো পৃথিবীর ডাঙ্গায়/কবিরা কলম ও বন্দুকের পার্থক্য ভুলে হাঁটতে লাগল খোলা ময়দানে।” কারণ, “তাঁর আহ্বান ছিলো নিশিডাকের শিসতোলা তীব্র বাঁশির মতো।” ভাবা যায়, কী শক্তিশালী কথামালা জুড়ে দিলেন কবিতায়! বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিলো এমন প্রেরণাদায়ক ও উজ্জ্বীবনীমূলক যে, মানুষ জীবনের মায়া ভুলে গিয়ে পতঙ্গের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়তো।

তাঁর ভাষণকাব্য এতোটাই শক্তিশালী ছিলো – “কবিরা কলম ও বন্দুকের পার্থক্য ভুলে হাঁটতে লাগল খোলা ময়দানে।” বঙ্গবন্ধুর ‘ভায়েরা আমার’ আহ্বানে “প্রতিটি মানুষের রক্তবাহী শিরায় কাঁপন দিয়ে তা বাজতো/নদীগুলো হিসহিস শব্দে অতিকায় সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়াতো/অরণ্যের পাখিরা ডাকাডাকি করে পথ ভুলে উড়ে যেতো সমুদ্রের দিকে।” আবার স্বাধীনতা মহাকাব্যের মহাকবি যখন ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্সে পঠিত তাঁর কবিতায় বললেন ‘ভাইসব’, “অমনি অরণ্যের এলোমেলো গাছেরাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল।”

টগবগে সাহসী তরুণরা কীটপতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো যুদ্ধের জ্বলন্ত ময়দানে। পাশাপাশি নিরীহ শব্দশিল্পীরাও কলমের পরিবর্তে আগুনের গোলা হাতে তোলে নিলো, “এই আমি/নগণ্য এক মানুষ/দেখি, আমার হাতের তালু ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে/এক আগুনের জিহ্বা।” এটি চিরন্তন সত্য যে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানেই মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো মুক্তির সংগ্রামে। তাঁর ঘোষণায় নিশ্চিত মৃত্যু যেনেও মানুষ হাতে তোলে নিয়েছিলো আগ্নেয়াস্ত্র।

নিরীহ নারী-পুরুষ সাহসী হয়ে রুখে দাঁড়াবার দৃষ্ঠতা প্রদর্শন করেছিলো, “বলো, তোমার জন্যই কি আমরা হাতে নিইনি আগুন?/নদীগুলোকে ফণা ধরতে শেখায়নি কি তোমার জন্য/শুধু তোমারই জন্য গাছে গাছে ফুলের বদলে ফুটিয়েছিলাম ফুলকি/আম গাছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফলেছিল/গ্রেনেড ফল। আর সবুজের ভেতর থেকে ফুৎকার দিয়ে/বেরিয়ে এলো গন্ধকের ধোঁয়া।”

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকাব্যটি আমাদের জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। পৃথিবীর অস্তিত্ব যতোদিন থাকবে, কবিতাটিও ততোদিন বেঁচে থাকবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মহাদলিল হিশেবে বঙ্গবন্ধুর মতো শির উঁচু করে। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না – ঐতিহাসিক ভাষণকাব্যটি নিয়ে এই পর্যন্ত যতো কবিতা লেখা হয়েছে, সব কবিতার সারমর্ম আলোচ্য কবিতা দুটি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং তৎকালীন রেসকোর্স পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্রকল্প হিসেবে আল মাহমুদের “নিশি ডাক” এবং নির্মলেন্দু গুণের “স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো” শিরোনামের কবিতা দু’টি অম্লান, অব্যয়, অক্ষয় হয়ে থাকবে।

মুহাম্মদ ইয়াকুব

কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.