মুহাম্মদ ইয়াকুব

#আরকানি ফুল#
পর্ব-এক

২৫ আগস্ট ২০১৭। গরম আবহাওয়ার সাথে ভারি বর্ষণ কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে নাগরিক জীবনে। ঘন মেঘে ঢাকা আকাশ এখন ফর্সা। পূবাকাশে রংধনু তীরাকৃতি ধারণ করে দূরের পাহাড়ের সাথে মিশেছে। চারপাশে কিছুক্ষণ পূর্বে চলা ভারি বৃষ্টির তাণ্ডবচিহ্ন। দৃষ্টিনন্দন সবুজ ঘাসের কার্পেট সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে দ্বিগুণ। সমাধিসৌধে একা দাঁড়িয়ে আছে চব্বিশ বছরের এক টগবগে যুবক। দেয়ালে আটকানো একটি নকশা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যেন মনোযোগী ছাত্র বই এর পাতায় গভীর নিমজ্জিত। চতুর্দিকের নীরবতা যুবকের ধ্যানে সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করছে। ঝাপটা বাতাসে উড়ে যাচ্ছে চার ইঞ্চি লম্বা সোনালি চুলের বাহার। জামা হতে খান্দানী সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ছে সমাধিসৌধের চতুর্দিকে। মায়ানমারের সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গুনের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত স্থানটি ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বসাধারণের নিকট খুবই পবিত্র ও সম্মানিত। এখানে শায়িত আছেন উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলনের অগ্রনায়ক, সর্বশেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। ঐতিহাসিক গুরুত্ববহ সমাধিসৌধটি ছুটির দিন লোকারণ্যে পরিণত হলেও প্রাকৃতিক বিরূপ আবহাওয়ার কারণে আজ অনেকটা নীরব। নির্জন পরিবেশকে নিজের আয়ত্বে নিয়ে বেশ সুখি সময় কাটাচ্ছে যুবক মেয়াও চু। যেন নির্মম ইতিহাসের সাথে মিশে নির্মমতার গভীরতা উপলদ্ধির প্রয়াস! বিধির কী নির্মম পরিহাস! দাপুটে মোগল রাজ পরিবারের সর্বশেষ সম্রাট নিজ ভূখণ্ডে মাত্র সাড়ে তিন হাত জমিও পেলেন না! সপরিবারে নির্বাসিত হয়েছেন আন্দামান সাগরের তীরে!

প্রতিদিন এটা মেয়াও চু’র কমন সময় কাটানোর স্থান। বুদ্ধির দিগন্ত খোলার পর হতেই বিগত ষোল বছর যাবত কিসের আকর্ষণে মেয়াও চু এখানে ছুটে আসে সেটা কেউই জানে না! সমাধি কমপ্লেক্সের মনোরম ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর এবং সম্রাটের স্ত্রী জিনাত মহলের বড় ফ্রেমে বাঁধাই করা দু’টি ছবি ঝুলানো আছে। সাথে শাহজাদা আব্বাসের ছবি, সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের রচিত কবিতাসমূহ বোবা দেয়ালের সাথে জীবন্ত থেকে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। নিয়মিত দর্শনের কারণে বাহাদুর শাহ জাফরের কবিতা সমগ্র মেয়াও চু’র মুখস্ত হয়ে গেছে। নিমগ্ন মেয়াও চু মুখস্ত কবিতাগুলো বার বার পড়ছে এবং ছবিগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। পরম মমতায় স্মৃতি চিহ্নগুলো স্পর্শ করছে।
হঠাৎ “ওহ আল্লাহ” শব্দের আর্তনাদ শুনে ছুটে গেলো মগ্নতা। একরাশ বিস্ময় সহকারে জানালার গ্রিলের মোটা ছিদ্র দিয়ে দৃষ্টি নিবন্ধ হলো দক্ষিণ পাশে ঘাসের কার্পেট বিছানো খোলা লনে। লাল টি-শার্ট ও কালো জিন্স পরিহিতা এক তরুণী পা চেপে ধরে বসে আছে। সম্ভবত পা মচকে গেছে! মেয়াও চু দৌঁড়ে গেলো ঘটনাস্থলে। সংকোচিত নীলাভ চেহারার তরুণী পূর্ব পাশে শোয়ে ডাগন প্যাগোডার দিকে আঙুল নির্দেশ করে কী যেন বুঝাতে চাইলো। নির্দেশিত দিকের ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় পাঁচ ফিট লম্বা একটি বিষাক্ত গোখরা। সোনার পাতে মোড়ানো প্রাচীন এই প্যাগোডার ঝোপ-জঙ্গলে মাঝে মধ্যেই বিষধর সাপ দেখা যায়। প্যাগোডার নিয়ম ও মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় আইনানুযায়ী সাপ মারা দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়ায় সাপের দৌরাত্ত এখানে অনেক বেশি ও স্বাভাবিক বিষয়।ফলে মায়ানমারে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়।
বুদ্ধিদীপ্ত মেয়াও চু’র বুঝতে আর বাকি রইলো না! বিষাক্ত সাপের নীল দংশনে আক্রান্ত মেয়েটির দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেয়াও চু। বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে গেলো! এতো সেই মেয়ে! কাবার আয় প্যাগোডা রোড়ের ত্রিমোহনায় কিছুক্ষণ পূর্বে যার সাথে তুমুল ঝগড়া হলো! গরম মেজাজের তরুণীটিকে অসহায় অবস্থায় দেখে ঠোঁটের কোণে একটি অদৃশ্য হাসি এসে মিলিয়ে গেলো!

মেয়াও চু ক্ষণিকের জন্য ফিরে গেলো মাত্র এক ঘন্টা পূর্বের স্মৃতিতে। নিজের গাড়ি ড্রাইভ করে আসছিলো ইয়াঙ্গুন শহরের ইয়ানকিন আবাসিক এলাকার নিজ বাড়ি হতে। প্রায় সত্তর কিঃমিঃ গতিতে অভিজাত এলাকার মসৃণ রাজপথে ইয়ানকি রোড-কানবে রোড হয়ে কাবার আয় প্যাগোডা রোডের টি পয়েন্টে এসে পড়লো গতিময় গাড়ি। এটি মূলত কাবার আয় প্যাগোডার সাথে সংযোগ সড়ক। কাবার আয় প্যাগোডা হতে দ্রুতগামী একটি কার কানবে রোডে উঠতে গিয়ে মেয়াও চু’র পাজেরোর পিছনের সাইডে ধাক্কা খেলো। কারের ডান পাশের বাম্পার কিছুটা বেঁকে গেছে। ঝড়ো গতিতে ড্রাইভিং সিট হতে বেরিয়ে আসলো বিধ্বস্ত এক অপরূপা সুন্দরী তরুণী। গলা হতে বেরিয়ে আসলো তীব্র গতির শব্দ বুলেটঃ “চোখে কি মলম লাগিয়েছেন? দেখে ড্রাইভ করতে পারেন না? আজ তো আমি মরেই গেছিলাম। নামুন। গাড়ি হতে নামুন। নামুন বলছি!”
: “মেডাম শান্ত হোন। দোষটা আপনার।”
: “চুুপ করুন আপনি। আগে গাড়ি হতে নামুন।”
: “আচ্ছা। নামলাম।”
গাড়ি হতে নেমে মেয়াও চু’র চোখ ঘুরে আসলো মেয়েটির আপাদমস্তক। নিরেট নিরীহ ও শান্ত স্বভাবের। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা মেদহীন উজ্জ্বল ফর্সা শরীর। ২২-২৩ বছরের ফুটফুটে তরুণীর টি-শার্টটি বুকের কাছে অপ্রতিরোধ্যভাবে উঁচু হয়ে আছে। ঢিলে টি-শার্টও আটকে রাখতে পারছে না যৌবনের জোয়ার। টানা হরিণীর চোখ হতে আগুন ঝরছে। অপূর্ব দেখাচ্ছে অগ্নিশর্মা মাটির পুতুলকে। চেহারা হতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে পবিত্রতার প্রতিচ্ছায়া। আপাদমস্তকে অাভিজাত্যের ছাপ।
: “এই যে জনাব! হা করে কী দেখছেন? কথা কানে যায় না?”
: “ম্যাম, আপনাকে দেখছি।”
তরুণী রাগে নাগিনীর মতো ফুঁসছে। চোখ ট-মুখ টুকটুকে লাল হয়ে গেছে।
: “নাটক মঞ্চায়ন করতে হবে না। আপনার ঠিকানা বলুন। আপনার এবং আপনার গাড়ির বিরুদ্ধে আমি পুলিশ কেস করবো।”
: “আরে বাব্বা! আমি কিন্তু ভয় পেয়েছি!”
: “আপনি সীমা অতিক্রম করছেন! আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে কিন্তু!”
: “বালু দিয়ে আটকেদিন।”
: “আচ্ছা আপনি কী মানুষ, নাকি অমানুষ! আমার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ, আমি বিপর্যস্ত! আর আপনি তাও ঠাট্টা করছেন!” অসহায় গলায় তরুণী।

ইতিমধ্যে উৎসাহী জনতার ভিড় জমে গেছে। আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হওয়ায় তরুণ মেয়াও চু গাড়ির ড্যাস বোর্ড হতে একটি ভিজিটিং কার্ড তরুণীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললোঃ “বৌদ্ধের কৃপায় বড় কোন অঘটন হতে বেঁচে গেছেন। দোষটা কিন্তু আপনার। মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা করে দেখুন।
ভালো থাকুন সব সময়।”
প্রতিউত্তরের ভ্রুক্ষেপ না করে হনহন করে ড্রাইভিং সিটে চড়ে বসলো মেয়াও চু। শোয়ে ডাগন প্যাগোডা রোড হয়ে সোজা সমাধিসৌধ।

“উহ” অস্পষ্ট চিৎকারে সম্বিত ফিরো পেলো।
বিলম্বিত প্রহরের জন্য অনুশোচনার অনল জ্বলে ওঠলো। দ্রুত গাড়ির টুলবক্স হতে একটি ছেঁড়া কাপড় নিয়ে এসে বসে গেলো তরুণীর পায়ের কাছে। ছেঁড়া কাপড়টি লম্বালম্বি ছিঁড়ে আরো কয়েক টুকরো করে রশি পাকিয়ে নিয়েছে। জিন্স পরিহিতা হওয়ায় কাজে সমস্যা হচ্ছে। মেয়াও চু তরুণীকে উদ্দেশ্য করে বললোঃ
“প্লিজ, কিছু মনে করবেন না। আপনার প্যান্ট কাটতেই হবে। না কাটলে কাজের অসুবিধা হবে।”
প্রায় নিস্তেজ রমণী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চোখের ইশারায় সম্মতি জ্ঞাপন করলো। ফাস্ট এইড বক্স হতে একটি কাচি বের করে দ্রুততার সাথে আক্রান্ত পায়ের হাঁটুর উপর হতে প্যান্ট কেটে নিলো। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেলো হাঁটুর চার ইঞ্চি নিচে মোট দু’টি ক্ষতচিহ্ন। প্রাথমিক চিকিৎসায় দক্ষ মেয়াও চু পরম যত্নে হাঁটুর সন্ধিস্থলের সামান্য উপরে রশি দিয়ে বেঁধে দিলো। তরুণীকে কোলে তুলে নিলো। দুই হাতের বেষ্টনীতে আবদ্ধ তরুণীর নিতম্ব। মেয়াও চু’র কাঁধে মাথা রেখে তরুণী মেয়াও চু’র গলা পেচিয়ে ধরেছে। তরুণীর তুলতুলে কোমল শরীর মেয়াও চু’র শরীরে লেপ্ট গেছে। যুবক মেয়াও চু’র শক্ত সবল বুকে তরুণীর উঁচু পাহাড়ের মৃত্তিকা ইমারত ঘর্ষণ খাচ্ছে। জীবনে প্রথম নারী দেহের স্পর্শ যৌবনের ভর দুপুরে অবস্থান করা মেয়াও চু’র দেহ বা মনে কোন ধরণের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলো না! যেখানে মানবতার প্রশ্ন সেখানে জৈবিকতা নিতান্তই মূল্যহীন। আতঙ্কিত তরুণীকে অভয়বাণী শুনিয়ে পিছনের সিটে বসিয়ে দিয়েই গাড়ি স্টার্ট করলো। আক্রান্ত নারী দেহের এক জোড়া পাথুরে চোখ অপলক তাকিয়ে রইলো। হয়তো ঘোর বিপদের তমসায়ও ভাবছে, ছেলেটাকে কতো অপমান করেছি! দোষটা তো আমারই ছিলো। আবার সেই ছেলেটিই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নিশ্চয় ছেলেটি খুব ভালো। কাজের প্রয়োজনে স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো ঘনিষ্ঠভাবে স্পর্শ করলেও তার প্রতিক্রিয়া ছিলো নিষ্পাপ। অথচ ছেলেরা সাধারণত সুযোগ নিতে চায়। নারীর দুর্বলতায় ঝাঁপিয়ে পড়াই যেন পুরুষের বৈশিষ্ট্য!বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী একটি দেশে এখনো এমন মহান যুবক আছে!

দ্রুত বেগে ছুটে চলছে গাড়ি। ইয়াঙ্গুনের ব্যস্ততম সড়ক শোয়ে ডাগন প্যাগোডা রোড হয়ে মূল হাইওয়ে ধরে ৯০ কিলোমিটার বেগে চলছে ল্যান্ড রোভারটি। বিশ মিনিটের মধ্যে ইয়াঙ্গুনের ইস্ট-ওয়েস্ট তেরামি হাসপাতালের পার্কিং গ্যারেজে পৌঁছে গেলো। হাসপাতালটি ইয়াঙ্গুনের বেশ নামি ও জনপ্রিয়। চিকিৎসা ব্যবস্থায় দুর্বল মায়ানমারের জন্য এটি প্রথম শ্রেণীর হাসপাতাল। সাথে সাথে হাসপাতালের ডাইরেক্টর অধ্যাপক ডাঃ ওয়াং চু নিজেই তাদেরকে রিসিভ করে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে গেলো। ডাঃ ওয়াং মেয়াও চু’র বড় ভাই হওয়ার সুবাধে পুরো হাসপাতালই তরুণীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ডজনখানেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হাজির হলো ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.