আমাদের আশেপাশের নিম্ন আয়ের মানুষদের মন-মানসিকতা আমাদের সমাজের অনেক উচ্চবিত্তদের চেয়েও অনেক বড়।
তাদের আপনি ১ ফোঁটা ভালবাসা আর সম্মান দিলে তার ১০ ফোঁটা আপনাকে ফেরত দিবে।

গাজীপুর থাকতে এক সবজি বিক্রেতার থেকে সবসময় সবজি নিতাম। নেয়ার সময় “মামা কেমন আছেন, বাসার সবাই ভালো” জিজ্ঞেস করতাম।
সে মামা প্রায়ই দেখা যেত এক কেজি/আধা কেজির জায়গায় অনেক সবজি ১০০/১৫০ গ্রামও বেশি দিয়ে দিত।
দেখেশুনে ভালো সবজিগুলো দিত, ভালো সবজি না থাকলে বলতো পাশের দোকান থেকে নিতে! শুধুমাত্র হাসিমুখে একটু কথা বলাতেই তার এত আন্তরিকতা ছিল।

প্রায়ই দেখি আমাদের অনেক সভ্য মানুষদের রিক্সাওয়ালা, বাসের কন্ডাকটরদের সাথে গলাবাজি, তুই-তোকারি করতে!
এমনকি হাতও উঠায় ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে!!
আমি বলছিনা সব রিক্সাওয়ালা বা বাসের কন্ডাকটর ভালো। তাদের মধ্যে অনেকেই আছে অসভ্য-বেয়াদব। আপনার জরুরি দরকার অথচ রিক্সাওয়ালা মামা সিগারেটে সুখটান দিয়ে বললো যাবেনা কিংবা না যাবার জন্য ৩০ টাকার ভাড়া ৮০ টাকা চেয়ে বসে। আমরা অনেক তথাকথিত শিক্ষিতরাই তো বড়বড় সার্টিফিকেট নিয়ে সভ্য হতে পারিনি। সে হিসেবে তাদের মত অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিতদের থেকে এমন আচরণ অস্বাভাবিক নয় আমি মনে করি। বাসের কন্ডাকটরদের ধৈর্য্য আর সহ্যশক্তি আমাদের চেয়েও হাজারগুনে বেশি। আপনার কাছে ভাড়া চাইলো, বললেন, সবার ভাড়া নিয়ে এসে তারপর নিতে!
কেন?
উনি তো একটা সিরিয়াল মেইনটেইন করছেন আর ভাড়া চাওয়াটাও তো স্বাভাবিক।
অথচ বেশিরভাগ কন্ডাক্টর বিনা প্রতিবাদে কিছু না বলেই এগিয়ে যায়। আমি কন্ডাক্টর হলে, নিশ্চিত ঝগড়া করে বসতাম! আবার যাত্রীর থেকে “ভাড়া নাই বা আর টাকা নাই” শোনার পরেও বেশিরভাগ কন্ডাক্টর “উঠার আগে কইতেন” ছাড়া কিন্তু কোন উচ্চ্যবাচ্চ্য করেনা। অর্থাৎ তাদের ছাড় দেয়ার মানসিকতাও অনেকের চেয়ে বেশি।

নিজেদের সভ্য প্রমাণ করার জন্য টেবিল ম্যানার বা অন্যান্য কার্টেসী শেখার সাথে সাথে আশেপাশের মানুষদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে শেখাটাও জরুরী। অন্যদের সাথে ভালো ব্যবহার, আন্তরিকতা বা সম্মান দেখানোয় লজ্জার কিছু নেই যদিও সে আপনার চেয়ে
“নিচু ক্লাসের” হয়! বরং তাদের সাথে আপনার সুন্দর ব্যবহারই আপনি কোন ক্লাসের সেটা প্রমাণ করে!

আপনি চাইলেই-
রিক্সা থেকে নেমে তাকে সালাম বা ধন্যবাদ জানাতে পারেন।
আমি সাধারণত রিক্সায় উঠে তাদের সাথে গল্প করি,
গন্তব্য শেষে রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে ধন্যবাদ বা সালাম দিয়ে সামনে হাঁটার সময় ঠিকই বুঝি উনি আমার দিকে এখনো তাকিয়ে আছেন।
আর উনার দৃষ্টিতে আছে সম্মান আর ভালবাসা।

অনেক সময় দেখা যায়
রিক্সাওয়ালা গন্তব্য না চিনে কম ভাড়া চাইলে বা
“চিনি না মামা, যা ভাড়া দিয়েন” বললে যথাস্থানে নামার পর ন্যায্য ভাড়া দিতে পারেন (দেয়া উচিত)। আমার সাথে অনেকবার এমনটা হয়েছে।
ঢাকা শহরে নতুন রিক্সা চালাতে এসেছে, না জেনে বা না বুঝে ৮০ টাকার ভাড়া ৫০/৬০ টাকা চেয়েছে।
আমি বিনাবাক্যে উঠে গিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে ৮০ টাকা দিয়ে কোথায় কত ভাড়া বুঝিয়ে দিয়েছি। উনার ন্যায্য পাওনা উনি না জানলেও আমি তো জানি। সেক্ষেত্রে সেই ২০/৩০ টাকা ঠকিয়ে কখনো আমি শান্তি পেতাম না। তাছাড়া সেই রিক্সাওয়ালা মামা আজ না হয় কাল ঠিকই কোথাকার কত ভাড়া জানবে। তার অসহায়ত্বের সুযোগে সেদিন ঠকানোর জন্য আজীবন তার কাছে আমি “বাটপার, জোচ্চর বা ঠগবাজ” হিসেবেই থেকে যেতাম যা শোধরানোর সুযোগ কখনো পেতাম না।

প্রকৃত সম্মান-আন্তরিকতা-ভালবাসা এমনি এমনি আসেনা,
তা অর্জন করতে হয় প্রকৃত সম্মান-আন্তরিকতা আর ভালবাসা দিয়েই।

মামুন আব্দুল্লাহ্
কবি ও সমাজকর্মী
লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.