বাংলা চলচ্চিত্র যাদের হাত ধরে এই যতটুকু সমৃদ্ধি বা বিস্তার লাভ করছে তার মধ্যে সাদেক বাচ্চু একজন। ১৯৮৫ সালে শহিদুল আমিন পরিচালিত ‘রামের সুমতি’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিষেক হওয়া সাদেক বাচ্চুর আসল নাম মাহবুব আহমেদ সাদেক। বাংলা চলচ্চিত্রের খল অভিনেতা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত হলেও মূলত তিনি মঞ্চ নাটক থেকে টিভি অভিনেতা হয়েই উঠে আসেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন দক্ষতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর । খল চরিত্র ছাড়া বহুমুখী চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন, বাংলাদেশে এমন খুব কম অভিনয় শিল্পী আছেন যারা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে দীর্ঘ সময় এমন অসংখ্য কাজ করার ধৈর্য্য ও সাহস ধরে রাখতে পেরেছেন। তুমুল জনপ্রিয় এই অভিনেতা ও নাট্যকারের পৈতৃক নিবাস চাঁদপুর জেলায় হলেও তার জন্ম ঢাকায় । তার বাবা ডাক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় ঢাকায় তারা স্থানী হয় । মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরই পিতৃবিয়োগে মাত্র পনের বছর বয়সে ডাক বিভাগে চাকরি শুরু করেন এবং ঐ অবস্থায় তিনি টি এন্ড টি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০১৩ পর্যন্ত সম্পূর্ণ মেয়াদে তিনি ডাক বিভাগের চাকরিটা করেন।

মাহবুব আহমেদ সাদেক ১৯৬৩ বেতারে ‘খেলাঘর’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনয় জীবন শুরু করেন। ১৯৭২-৭৩ সময়ে তিনি ‘গণনাট্য পরিষদ’ নামের একটি থিয়েটারে যুক্ত হন। তিনি উম্মোচন ও প্রথম পদক্ষেপ নামের আরো দুটি থিয়েটার দলের হয়ে মঞ্চে অভিনয় করেন। দলগুলির মধ্যে প্রথম পদক্ষেপ তার নিজের গঠিত দল। ১৯৮৪ সালে তিনি ‘মতিঝিল থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এদলটির হয়ে তিনি এখনো নাটক রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয় করছেন। তার রচিত ও নির্দেশিত নাটকগুলির মধ্যে কাফনের পকেট নাই, কুলাঙ্গার ও ক্যাপ উল্লেখযোগ্য।

১৯৭৪ সালে তিনি টেলিভিশনে অভিষিক্ত হন। তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক আব্দুল্লাহ ইউসুফ ইমাম তার মঞ্চ অভিনয় দেখে আকৃষ্ট হন। ইমাম প্রযোজিত ‘প্রথম অঙ্গীকার’ নাটকের মাধ্যমে মাহবুব আহমেদ সাদেক টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করেন। টেলিভিশনে তিনি ঝুমকা, পূর্ব রাত্রি পূর্বদিন সোজন বাদিয়ার ঘাট, নকশী কাঁথার মাঠ, জোনাকী জ্বলে, গ্রন্থিক গণ কহে’র মত জনপ্রিয় নাটকসহ এক হাজারের বেশী নাটকে অভিনয় করেছেন। টেলিভিশনে নাটকের পাশাপাশি অনেক বিজ্ঞাপনেও অভিনয় করেছেন তিনি।

১৯৮৫ সালে রামের সুমতি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বড় পর্দায় অভিষিক্ত হন। তার অভিনীত প্রথম দিকের চলচ্চিত্রে তিনি নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ে করেন। সুখের সন্ধানে চলচ্চিত্র দিয়ে খল চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। এরপর থেকে খল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরিচালক এহতেশাম-এর চাঁদনী চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তার মঞ্চনাম ‘সাদেক বাচ্চু’ এহতেশামের দেয়া। চাঁদনী চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময় এহতেশাম তাকে এই নাম দেন। এরপর থেকে তিনি তার মঞ্চনাম সাদেক বাচ্চু নামে চলচ্চিত্র জগতে পরিচিতি পান। মাহবুব আহমেদ সাদেক তার অভিনয় জীবনে প্রায় ৫০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।অভিনয় জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে ২০১৮ সালে একটি সিনেমার গল্প চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে-
বিদ্রোহী (২০২০), এক পৃথিবী প্রেম, চলো পালাই, বেপরোয়া (২০১৯), প্রেম চোর (২০১৯), ডনগিরি (২০১৯), পদ্মার প্রেম (২০১৯), ইন্দুবালা (২০১৯), পলকে পলকে তোমাকে চাই (২০১৮), ধ্যাততেরিকি (২০১৭), বসগিরি (২০১৬), মাটির পরী (২০১৬), মিয়া বিবি রাজি (২০১৬), রাজা ৪২০ (২০১৬), পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২ (২০১৬), বুলেট বাবু (২০১৬), ভালোবাসাপুর ( ২০১৬ ), ব্ল্যাক মানি (২০১৫), আরো ভালোবাসবো তোমায় (২০১৫), লাভ ম্যারেজ (২০১৫), কমিশনার (২০১৫), লাভার নাম্বার ওয়ান (২০১৫) ভালোবাসা সীমাহীন (২০১৫), দুই পৃথিবী (২০১৫) মহুয়া সুন্দরী (২০১৫), রাজাবাবু – দ্য পাওয়ার (২০১৫), স্বপ্ন যে তুই (২০১৪), লোভে পাপ পাপে মৃত্যু (২০১৪), ভালোবাসা জিন্দাবাদ (২০১৩), তোমার মাঝে আমি (২০১৩), জীবন নদীর তীরে (২০১৩), জোর করে ভালোবাসা হয় না (২০১৩), ঢাকা টু বোম্বে (২০১৩), জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার (২০১৩), দুর্ধর্ষ প্রেমিক (২০১২), জিদ্দি মামা (২০১২), বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না (২০১২), মায়ের চোখ (২০১০), আমার স্বপ্ন আমার সংসার (২০১০), এক জবান (২০১০), মন বসে না পড়ার টেবিলে (২০০৯), মায়ের হাতে বেহেস্তের চাবি (২০০৯), বধূবরণ (২০০৮), ময়দান (২০০৭), আমার প্রাণের স্বামী (২০০৭), কোটি টাকার কাবিন (২০০৬), পিতা মাতার আমানত (২০০৩), বন্ধু যখন শত্রু (২০০১) , মরণ কামড় (১৯৯৯), কে আমার বাবা (১৯৯৯), লাল বাদশা (১৯৯৯), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), প্রিয়জন (১৯৯৬), ডিসকো ড্যান্সার (১৯৯৪, )সুজন সখি (১৯৯৪), রামের সুমতি (১৯৮৫) ইত্যাদি

বাংলা চলচ্চিত্রের বেহাল দশা ও নিজের প্রতি অবমূল্যায়ন দেখে তিনি অনেক আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘অভিনয়শিল্পীর কোনো অবসর নেই। এ দেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে মনে করা হয় অভিনয়শিল্পী সিনিয়র হয়েছেন মানে তাঁকে আর প্রয়োজন নেই। কীভাবে তাকে বিতাড়িত করা যায়, সেটা ভাবতে সবাই উঠেপড়ে লাগেন। ও সিনিয়র হয়ে গেছে? তবে ওকে বাদ দিয়ে দাও।’
খ্যাতিমান এই অভিনেতা ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০-এ ঢাকার মহাখালীতে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
একজন শিল্পীকে যতই অবহেলা করুক, তার সৃষ্টিকর্ম তাকে বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল। সাদেক বাচ্চুর সৃষ্টিকর্মের সম্ভার এতো বেশি যে, সময়ের পাতায় পাতায় তার চিহ্ন পড়ে রবে বাংলা চলচ্চিত্র, নাট্যপাড়া ও সংস্কৃতির দেয়ালে দেয়ালে ।

✍মাসুদ পারভেজ
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া ও অনলাইন

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.