যুগ যুগ ধরে বিশ্বের নারীরা তাদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিভিন্নভাবে। নারীরা তাদের কর্ম-প্রচেষ্টা, দৃঢ় মনোবল, আর আত্মবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে এগিয়েও যাচ্ছেন অনেক দূর। এই এগিয়ে যাওয়ার রাস্তাটা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়, তাদেরকে প্রতিনিয়ত বিচলিত হতে হচ্ছে পদে পদে! ঘরে,বাইরে, কর্মক্ষেত্রে সম্মুখীন হতে হচ্ছে নানা ঘাত প্রতিঘাতের, ভূগতে হচ্ছে অনিরাপত্তায়, স্বীকার হতে হচ্ছে বৈষম‍্যের!

চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে তবুও নারীরা অনবরত চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের অধিকার আদায়ের! সময় পাল্টানোর সাথে সাথে সমাজে নারীদের প্রতি অবিচারের ধরণও পাল্টাচ্ছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে নারীদের একটা বিরাট অংশ প্রতিদিন বিভিন্নভাবে নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন, এমনকি মৃত‍্যুবরণও করছেন।

প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস যার পূর্বনাম ছিল আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস! সারা পৃথিবীজুড়ে নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষকে কেন্দ্র করে সম-অধিকার আদায়ের লক্ষ‍্যে দিবসটি উদযাপন করে থাকেন।

পৃথিবীর এক এক প্রান্তে দিবসটি উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য এক এক রকম হয়ে থাকে। তার মধ‍্যে কোথাও হয়তো নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান, শ্রদ্ধা হয় দিবসটি উদযাপনের মুল বিষয়, আবার কোথাও নারীদের আর্থিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা হয় মূখ‍্য বিষয়।

যেভাবে দিবসটির সূচনা:
সকল দিবসের পেছনেই কোন না কোন ইতিহাস থাকে, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের পেছনেও রয়েছে একটি উল্লেখযোগ‍্য ইতিহাস, নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করণসহ কর্মক্ষেত্রে অমানবিক পরিবেশ দূরীকরণের লক্ষ‍্যে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমে এসেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা।

তখন তাদের উপর চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। এরপর ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠন আয়োজন করে এক নারী সমাবেশের। তখন জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন।

ক্লারা জেটকিন ছিলেন একজন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। তারপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় বারের মতো আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। উক্ত সম্মেলনে ১৭টি দেশ থেকে মোট ১০০ জন নারী প্রতিনিধি যোগদান করেন।

ওই সম্মেলনে প্রতি বছরের ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন ক্লারা জেটকিন। এর ফলে ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালন করার সিদ্ধান্ত আসে। দিবসটি পালনের উদ্দেশ‍্যে এগিয়ে আসেন বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমাজতন্ত্রীরা।

এরপর ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ দিবসটি পালিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার আগে থেকেই বাংলাদেশে দিবসটি পালন করা শুরু হয়। এরপর ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানানো হয় এই দিবসটি পালন করার জন‍্য। এরপর থেকে সারা বিশ্বজুড়ে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ‍্যে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক নারী দিবসটি।

এ বছর নারী দিবসে জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’।

বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয় । আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, চীন, মেসিডোনিয়া, নেপালসহ আরো অনেক দেশ রয়েছে এই তালিকায়; যেসব দেশে কেবল নারীরাই সরকারী ছুটি পেয়ে থাকেন এই দিনটিতে।

সম-অধিকার নিয়ে নিরাপদে থাকুক পৃথিবীর প্রতিটা নারী! নারী নয়, মানুষের পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকুক এই ধরায়।

সবাইকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা!

__সৈয়দা হাসিনা দিলরুবা (ইয়াসমীন)
প্রধান সম্পাদিকা, আর্লি-স্টার ডট কম।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.