নীরবতা মানুষের ভাবনা জগতকে এত বেশি প্রসারিত করে, চাইলে লাগামহীন দুরন্ত ঘোড়ার মতো দাপিয়ে বেড়ানো যায়। জীবনের ছোট ছোট বিষাদ গুলো দানবীয় রূপ নিয়ে ভাবনার আকাশে উঁকি দেয়। মানুষ প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির হিসেব কষতে বেশি অভ্যস্ত, আমিও তার বাইরে নয়। অতি মানবীয় গুণাবলী থাকলে হয়তো করতাম না। আকাশটা ভীষণ অভিযোগ নিয়ে যেন আমার দিকে তেড়ে আসছে, এখনি বৃষ্টি হতে পারে। কালক্ষণ বিলম্ব না করে আমার উচিত রুমের ভেতর চলে যাওয়া, কিন্তু আমি যাবো না। আমার অনেক কথা আছে এই উতলা উচ্ছৃঙ্খল বাতাসের সাথে, মেঘের সাথে।
পুরা ছয়তলা বিল্ডিংয়ে আমি আর কেয়ারটেকার মনির ছাড়া তৃতীয় কোন প্রাণী নেই। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণা নিঃসন্দেহে সবাইকে ঈদের খুশির চেয়ে চারগুণ মুনাফা আকারে দিয়েছে বললে ভুল হবে না। বড় বড় ব্যাগ কাঁধে পিঠে চড়িয়ে গ্রামের পথ ধরেছে সবাই, বেঁচে থাকার টানে অথবা মরে যাবার ভয়ে। আমার মধ্যে ঐ দুটির একটিও নেই, তাই যাওয়া হয়নি আর মনির তার পেটের দায়ে যেতে পারেনি। বরিশাল গ্রামের বাড়িতে তার পোয়াতি বউ, বছরখানেক হয় বিয়ে করছে, সাথে আছে তার বৃদ্ধ মা, আরেকটা বিবাহ উপযুক্ত বোন।
এক বিল্ডিংয়ের বাসিন্দা হলেও মনিরের সাথে আমার দুরত্ব কম না, সে থাকে সিড়ির নীচে একটি ছোট্টরুমে আর আমি একদম ছাদের চিলেকোঠায়। বেচারা দিনে পাঁচ সাতবার এটা ওটা খাবার রান্না করে আমার জন্যে নিয়ে আসে। যেহেতু এখন বুয়া নেই সেহেতু মনিরের এই সেবা নেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায়ও নেই।
বৃষ্টিটা একটু কমলে আমি ভেজা শরীরে রুমে ঢুকতেই মনির চা নিয়ে এসে হাজির -নিয়ন ভাই আপনে আবার বৃষ্টিতে ভেজলেন? মুই প্রায়ই দেহি আপনের সর্দি জ্বর লাইগ্গ্যাই থাহে। আজব কিসিমের মানুষ একখান ।
-আরে কিচ্ছু হবে না,
-হেইডা আপনে কইলে অইবে? ডাক্তার কইছে অহন সর্দি কাশি খুব বিপজ্জনক। করোনা যদি ধরে মুগো দেশে বাঁচার আশা করা জাইবে না। আপনের দেশ গেরামে খবর লইছেন?
-আমার কে আছে কার খবর নেব বলো, তোমার খবর বলো।
-আছে আলহামদুলিল্লাহ, সবাই ভালোই আছে। তয় বউয়ের লাইগ্গ্যা পরানডা কাইন্দা ওডে। নামাজ কালাম পইড়া আল্লাহর কাছে দোয়া করা ছাড়া আর কিছু করার নাই।
-আচ্ছা মনির আমার তো সিগারেট প্রায় শেষ, দেখ না আরেক প্যাকেট ব্যবস্থা করা যায় কিনা।
-এই সিগারেট না খাইলে কী অয়, দেন টাহা দেন, দেহি কী করা যায় ।
মনির আসলেই তাকে বিদায় করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তার অতি ভালবাসা আমাকে যতটা আনন্দ দেয় তার বেশি বিরক্ত হই। সে কথা বলা শুরু করলে শ্রোতাকে বিরক্ত না বানিয়ে ছাড়ে না। গল্পের শুরু যেখান থেকেই হোক তার শেষ কোথায় সেটা মনির নিজেও জানে না। তবুও তার আন্তরিকতা অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার নেই।
মনির আর আমার এভাবে আরো সাত আট দিন কেটে গেল, গত চারদিন ধরে আমাদের দুজনের সর্দি কাশি এক তুমুল পর্যায়ে পৌছে গেছে, উপায়ান্তর না দেখে দুজনই করোনা টেস্ট করাতে গেলাম, তিনদিন পরে রিপোর্ট আসবে সে পর্যন্ত অপেক্ষা করছে হচ্ছে। মনের ভেতর এক অজানা ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, মানুষ বেঁচে থাকাটা যতই নিরর্থক মনে করুক মৃত্যু এক বীভৎস ভয়ঙ্কর সত্যকে মেনে নিতে পারে না। বাবা-মা ও একমাত্র বোনকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছি একবছরও হয়নি, মাঝে আবার সেহেলীর বিয়ে হয়ে গেল। সব মিলিয়ে কারো জন্য বেঁচে থাকা প্রয়োজন পড়ে না ।
তবুও মৃত্যুর ভয়।
রাতের আকাশ ভীষণ রকম নীরবতা নিয়ে বসে আছে শহরের কোলাহল কদিন ধরে বেশ নিস্তব্ধ, আকাশের তারার মতো নিভু নিভু জ্বলছে ল্যাম্প পোস্টের বাতি। এতোটা সুন্দর রূপ ধরে আছে কখনো এভাবে খেয়াল করিনি। আকাশের নীচে তারা, তারার নিচে এ যেন উপ-তারা। সত্যিই পৃথিবী এক অদ্ভুত সুন্দরের সমাহার, হৃদয়ের চোখ দিয়ে যেটাই দেখা হয় সেটাই সুন্দর । এই ভালো লাগার সবচেয়ে বড় কারণ আজ আমাদের দুজনের রিপোর্ট এসেছে আমার নেগেটিভ আর মনিরের পজিটিভ । আমরা নিজেদের বেঁচে থাকাটাই বেশি উপভোগ করি। আমার চিন্তার দরজায় একবারও কড়া নাড়ছে না- মনির কি ফিরে আসবে? যদি ফিরে না আসে তার বৃদ্ধ মা, বোন ও বউয়ের কি হবে? কি হবে তার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত? জোছনাময়ী চাঁদ ধীরে ধীরে আলো হারিয়ে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে, রাতও হেঁটে যাচ্ছে তার শেষ গন্তব্যে। মানুষের জীবনের অনাকাঙিক্ষত কোন বার্তা নিয়ে হয়তো অপেক্ষা করছে আরেকটি দিন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.