দেশে ও প্রবাসে নারী

রওশন আরা ক্লিনিকের আজ শুভ উদ্বোধন। ঢাকা শহরের অনেক গুণীজন সমবেত হয়েছেন অনুষ্ঠানে।ক্লিনিকের প্রধান চিকিৎসক এবং প্রতিষ্ঠাতা অভি রহমান সবার সাথে কুশল বিনিময় করছেন।মায়ের নামে এই ক্লিনিকটা দিতে পেরে তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন।

প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেছেন রওশন আরা বিলকিস।তার চোখে আজ আনন্দাশ্রু।ছেলের জন্য গর্বে তার বুক ভরে যাচ্ছে।সবার সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলেন।

সেদিন রাতে রায়হান অফিসের নারী কলিগ নিয়ে বাসায় এলো।এসেই তার সাথে বসে আনন্দ ফুর্তিতে মশগুল।বিলকিস তাকে বাঁধা দেয়।বাহিরে ফুর্তি করছো করো,কিন্তু বাসায় কেন?ছেলে দেখছে বাবার কুর্কীতি।রায়হান উত্তেজিত হয়ে সেদিনও বিলকিসের গায়ে হাত তুলে।এক পর্যায়ে বাসা থেকে বের হতে বলে।

অভি তখন নয় বছরের।মায়ের প্রতি নিত্য এই অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে,সেদিন সাহস করে মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।এক কাপড়ে মা ছেলে রাস্হায় নামে।অভি খেয়াল করে শুধু মাটির ব্যাংকটা নিয়ে আসে।স্কুলের টি’ফিন থেকে কিছু টাকা তাতে জমানো ছিল।এত অল্প টাকা,কোথায় যাবে,কি খাবে?তারপরেও সাহস মা আছে সাথে।বিলকিস অবাক হচ্ছে ছেলের সাহস দেখে।

তারপর রাতের ট্রেনে দুজন সোজা ঢাকা শহরে চলে আসে।রেল ষ্টেশনে মা,ছেলে কয়দিন খেয়ে না খেয়ে রাত কাটায়।অল্পদিনে অভি এক হোটেলে প্লেইট বাসন মাজার কাজ পায়।কোনরকম বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নেয়।বিলিকিসও বাসা বাড়ির একটা কাজ জুটিয়ে নেয়।শুরু হয় মা,ছেলের সংগ্রামী জীবন।

এত কষ্টে থেকেও অভি লেখাপড়া বাদ দেয়নি।স্কুল থেকে এসে বিকালে হোটেলের কাজ করতো।বিশ্বস্ত কর্মচারী হিসেবে মালিকের সুনজরে আসে অভি।নিজের কোন সন্তান না থাকায় মালিক অভিকে ছেলের মতো দেখতো।অভির পারিবারিক অবস্হা জেনে অভির প্রতি মালিকের দয়া হয়।নিজের বাসায় একটা ফ্লাটে তাদের থাকতে দেয়।

অভি এখন হোটেল বয় নয়।হোটেলের ম্যানেজার।মালিকও অভির উপরে সব দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত।বাসা বাড়ির কাজ বিলকিস কবে ছেড়ে দিয়েছে।তারপর আস্তে আস্তে ঘুরে গেলো অভির জীবনের চাকা।দিনে কলেজ রাতে কাজ।এস এস সি,এইচ এস সি প্রতিটি পরীক্ষায় অভি ভালো রেজাল্ট করে।

তারপর মায়ের ইচ্ছায় ডাক্তারী পড়া।পাশ করে বেশিদিন অপেক্ষা করা লাগেনি,প্রাইভেট ক্লিনিকে জব পেয়ে যায়।তারপর এফ আর সি এস ডিগ্রি নিয়ে নিজেই চেম্বার খুলে বসে।বাসা কিনে।তারপর অনেক দিনের সখ মায়ের নামে ক্লিনিক।

নিজের ক্লিনিকে অভি আজ প্রথম কাজে যোগ দিলো।এক এক করে বিভিন্ন কেবিনে রোগীদের সাথে আলাপ করে জেনে নিচ্ছে তাদের অবস্হা।কিন্তু একি দশ নাম্বার কেবিনের রোগীকে দেখে অভি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা।জীর্ণ দেহের মুমূর্ষ এই রোগী যে তার এক সময়ের খুব পরিচিত মুখ।

শাহারা খান
কবি ও লেখিকা
লন্ডন প্রবাসী (বাড়ি-সিলেট)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.