কথামতো নীলা ঠি’ক পৌনে চারটায় আসাদ গেইটে এসে পৌঁছুলো। সেখানে এসে আকাশের দেখা পাওয়ার কথা।কিন্তু আকাশকে না পাওয়ায় নীলার মেজাজ বিগড়ে গেলো।মনে,মনে ভাবলো আসুক তারপরে মজা দেখাবো।কিন্তু অপেক্ষা করে করে যখন বেলা বাড়তে থাকলো,নীলা কয়েক বার ফোন দিলো,আকাশের ফোন বন্ধ।নীলা এবার টেনশনে পড়ে গেলো। আকাশের সাথে আজ ওর বিয়ে হওয়ার কথা।কাজী অফিসে বিয়ে করে তারপর চলে যাবে আকাশের গ্রামের বাড়িতে। নীলা কত কষ্ট করে বাসার সবার আড়ালে ব্যাগ নিয়ে চলে এসেছে। আসার সময় আর ফিরবেনা বলে চিঠি লিখে রেখে এসেছে।এখন কোন মুখে সে বাসায় ফিরবে? নীলা আকাশের পরিচিত বন্ধু-বান্ধব অনেকের কাছে ফোন দিলো।কেউ আকাশের খবর দিতো পারলোনা। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হওয়ার উপক্রম।অগত্যা নীলা বিষন্ন মনে বাসায় চলে এলো।

এদিকে নীলার চিঠি পেয়ে বাসার সবার মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। নীলার বাবার চিৎকার চেচামেচিতে বাসার সবাই ভয়ে জড়োসড়ো। তিনি বারবার বলছেন,বন্ধুকে তিনি মুখ দেখাবেন কি করে?কত স্বপ্ন ছিলো,আমেরিকা প্রবাসী বন্ধুর ইন্জিয়ার ছেলের কাছে মেয়ের বিয়ে দিবেন। আত্মীয়-স্বজন সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়েগেছে। আর মেয়ে কিনা চুনকালী মাখালো।এমন সময় কলিংবেলের শব্দ শুনে দরজা খুলতেই,নীলাকে দেখে সবাই অবাক!নীলার মা মেয়েকে নিয়ে রোমে ঢুকলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,কেন পাগলামী করছিস মা?তোর বাপ তো তোর ভালোর জন্যই চেষ্টা করছেন। এমন সোনার টুকরো ছেলে সহজে মিলবেনা।তুই আর অমত করিছ না।সপ্তাহ খানেকের মধ্যে নীলার বিয়ে গেলো।

বিয়ের ছ’মাসের মধ্যে নীলা আমেরিকা চলে এলো।নীলার হাজবেন্ড সজীব খুব উদারমনা।নীলার প্রতি সহাভূতিশীল। গভীর ভালোবাসে নীলাকে।নীলা অনেক বার বলতে চেয়েছে তার অতীতের কথা।কিন্তু সজীবের তাতে কোন আগ্রহ নেই।সজীবের মতে,তুমি আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যত। তোমার অতীত জেনে আমার কি লাভ?

স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে নীলা খুব সুখে আছে।শশুড় বাড়ির সবাই নীলাকে খুব আদর করেন। নীলার বাবা মা ও আমেরিকা চলে এসেছেন। নীলার জীবনের কোন চাহিদা আর নেই।তবে একটি প্রশ্ন নীলাকে বারবার তাড়া করে,আকাশ কেন নীলার সাথে এমন প্রতারণা করলো?

বাইশ বছর পর ছেলের বিয়ে করাতে নীলা দেশে এসেছে।ঘটক মারফত একটা মেয়েকে পছন্দ হলো।ফুটফুটে চাঁদের মতো মেয়ে। একদেখাতেই নীলা মেয়ের হাতে আংটি পড়িয়ে বিয়েতে সম্মতি জানালো। বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের মামাকে দেখে নীলার মাথা ঘুরতে লাগলো। এতদিন পর সে কাকে দেখছে?

জ্ঞান ফিরে এলে নীলা দেখলো,সে হাসপাতালে শুয়ে আছে। ছেলে আর ছেলের বউ তার মাথার কাছে বসে আছে। সাথে ছেলের শশুড় শাশুড়ী আর মামা। একে,একে সবাই চলে যেতে উদ্যত হলে,শুধু মামা রয়ে গেলাম।নীলা বললো এরা সবাই চলে যাচ্ছেন।আপনি কেন রয়ে গেলেন? ডাক্তার আকাশ বললো, রোগীকে রেখে আমি কি করে যাই?

তারপর আকাশের সাথে নীলার অনেক কথা হলো।সেদিন আসাদ গেইটে আসার মুহূর্তে বাড়ি থেকে ফোন আসে,মায়ের অবস্হা খুব খারাপ।সাথে, সাথে আকাশ গ্রামে রওয়ানা দেয়। আসার পথে ছিনতাইকারী হাত থেকে মোবাইল নিয়ে যায়। তাই নীলাকে ফোন করতে পারেনি।বাড়ি এসে মায়ের অবস্হা আশংকাজনক দেখে,তাকে পরেরদিন ঢাকা নিয়ে আসে। সেখানে এসে অনেকবার চেষ্টা করেছে নীলার সাথে যোগাযোগ করতে,কিন্তু পারেনি। একজন ডাক্তার হিসেবে, তখন তার কাছে রোগী ছিল বড়। অন্যদিকে তার মা।অপারেশন করার এক সপ্তাহ পর মায়ের জ্ঞান ফিরে। মাকে আশংকামুক্ত রেখে আকাশ ছুটে আসে নীলার বাসায়।কিন্তু গেইটে এসে বিয়ের সাজ সজ্জা দেখে জানতে পারে নীলার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।আর তাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। নীলার সুখের কাঁটা হতে চায়নি আকাশ।আকাশের মুখের কথাগুলো শুনে নীলার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,তাহলে তুমি আমার সাথে প্রতারণা করোনি।

শাহারা খান
কবি, লেখিকা
ইংল‍্যান্ড প্রবাসী ( বাড়ি- সিলেট)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.