চলছে বইমেলা, চেতনার মেলা, বাঙালি লেখকদের মিলনমেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য লেখকের বই। কিন্তু বেশিরভাগ লেখক তাদের বইয়ের নামকরণ নিয়ে একেবারেই সচেতন নয় বলে মনে হচ্ছে।

বর্তমান লেখকরা ‘বইয়ের প্রচ্ছদ’ দেখিয়ে পাঠকদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। পাঠকরাও এসব বই কিনে বাসায় নিয়ে পড়ে হতাশ হচ্ছেন। কথায় আছে, ‘চকচক করলেই সোনা হয় না’। চাররঙের ঝকঝকে প্রচ্ছদ আছে ঠিকই কিন্তু বই পড়ে দুই-একটা লাইন থেকে পাঠক শিখবে তাও নেই। এমন দৃশ্য দেখা যায় বেশিরভাগ নবীন লেখকের ক্ষেত্রে। তারা নিজেরাই জানে না যে, কী করতে বসছে! সারা বছরের টিউশনের টাকা বাঁচিয়ে বই করছে, আবার কেউ চাকরির পয়সা দিয়ে করছে। যেভাবেই করুক্, এটা একটা বয়সের দোষ!

ফেসবুকেও জনপ্রিয় লেখকের অভাব নেই! প্রেমের রস মাখিয়ে লিখা হচ্ছে অসংখ্য গল্প। উঠতি বয়স! তাদের বন্ধুতালিকায় সাধারণত লেখক না থাকায় তাদের লেখায় ভুল ধরা বা সমালোচনা করার মতো কেউ নেই!

যা লিখে সাধারণ পাঠক তাতে রসমাখা মন্তব্য দিয়ে বসে। বই কিনে। অথচ বইয়ের মানের বিচার করার সময় তাদের নাই। এই হলো আমাদের দেশের পাঠকদের প্রধান সমস্যা।  আমি নিজে তাদের অনেক লেখা পড়েছি। বাক্যগঠনে ভুল, কাহিনী ওলটপালট, অসংখ্য বানান ভুল। কোথায় ‘ কী ‘ হবে আর কোথায় ‘ কি ‘হবে এই সাধারণ ধারণাটা’ই রাখে না তারা।

প্রতিমেলায় বই করছে। বিক্রি হচ্ছে প্রচুর। বই বেশি বিক্রি হলেই প্রকৃত লেখক হওয়া যায় না। লেখক হতে গেলে শুদ্ধ চেতনা দরকার। অনেক পড়াশোনা দরকার সাহিত্য নিয়ে। অনেক সাধনা দরকার। আর তাদের বইয়ের নামও কমন! কোন লেখকের বইয়ে এই নাম আছে! নামটাও কি নতুন বা সৃজনশীল দেয়া যায় না? এই হলো অবস্থা!!

প্রথম অবস্থায় নবীন লেখকরা বয়সের দোষে এমন কাণ্ড করে থাকে! কয়েকটা লেখা লিখেই প্রকাশনীর সঙ্গে চুক্তি করে বসে! নবীন লেখকদের উচিত হাতে প্রচুর সময় নিয়ে বই করা।

এবার আসি আসল কথায়। অনেকেই বইয়ের নাম এমনভাবে ব্যবহার করেন যা অনেক পূরনো কিংবা আধুনিকতার সঙ্গে কোনো মিলই নেই। যেমন, অনুভূতির কাব্য, বেদনাময়ী কাব্য, চিঠির ভাষা, ভূতের কাব্য প্রভৃতি। এসব নাম শুনতে কি আপনার ভালো লাগে? এগুলোর মাঝে কি আপনি কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া পান? এমন নাম দেখে বইটা কেনার বা ভেতরের পাতা ওল্টানোর ইচ্ছে জাগবে? অবশ্যই না।

তাছাড়া নামগুলো নিয়ে একটু ভেবে দেখুন, ‘ অনুভূতির কাব্য ‘ কাব্য বা কবিতা তো অনুভূতিরই। তাই না? তাহলে নতুন করে ‘ অনুভূতির কাব্য ‘ রাখা কি দরকার? 

আর যদি এমন হতো, নিঃসঙ্গ পৃথিবী চোখের ওপর কেমনে হাঁটে, ভূত যখন বিজ্ঞানী, ক্ষুধার্ত ধানের নামতা, মেডিটেশনগুচ্ছ, ডোম, নাভীর নিকট মৃত্যু; তাহলে কেমন হতো? নামগুলো শুনতে ভালো লাগে না? অবশ্যই নামগুলা চোখে পড়লেই ভাবনা আসবে, নিঃসঙ্গ পৃথিবী চোখের ওপর কেমনে হাঁটে? ভাবায় এই শিরোনামগুলা। তখন পড়তে এবং জানতে তুমুল ইচ্ছে করবে।

তদ্রূপ ধরুন ‘ভূত যখন বিজ্ঞানী ‘ অবশ্যই শিশুদের মনে ভাবনা আসবে ভূত কিভাবে বিজ্ঞানী হলো? জানতে হবে, জানতে হলে পড়তে হবে। এসবের প্রচ্ছদ যেমনই হোক না কেন শিরোনামে আমরা সচেতন হলে পাঠক আমাদের বই পড়বে পড়বেই। তাই আসুন আমরা প্রচ্ছদের দিকে নজর না দিয়ে ভালো মানের লেখার পাশাপাশি আধুনিক শিরোনাম ব্যবহার করি।

জয় হোক সব লেখকের।

লেখক: কবি ও সাহিত্য সম্পাদক, লন্ডন টাইমস নিউজ।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.