বাংলা একাডেমী-যার ‘একাডেমী’ শব্দটিও বিদেশী

বাংলা বানান ও বর্ণ বিতর্ক বিষয়টি ব্যাপক। অনেকে মনে করেন বাংলা বানান পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। দু’টি- জ, তিনটি -শ , ত- এবং- ৎ- এর প্রয়োগ, হ্রস্ব- এবং দীর্ঘ স্বরের জন্য স্বতন্ত্র চিহ্ন এবং কতেক যুক্ত ব্যাঞ্জনের অস্বচ্ছ রুপ বানান ও মুদ্রন পদ্ধতিকে আরো সমস্যা সংকুল করেছে ।
দীর্ঘকাল থেকে বাংলা বানান সংস্কৃত ভাষার দুর্বোধ্য কঠিন নিয়মও অনুশাসনে চলে আসছে বা চাপিয়ে দেয়া হয় । সুলতানী শাসন ও মোগল শাসনামলে ভারতবর্ষের রাস্ট্র ভাষা ছিল ফার্সী এবং ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের রাস্ট্র ভাষা ছিলো ইংরেজী । যার কারনে বাংলা ভাষার আধুনিককালে অর্থাৎ আঠারো’শ শতকের মাঝামাঝিতে যখন বাংলা ভাষায় পূনর্জাগরন ঘটে বাংলা ভাষায় কালজয়ী অনেক লেখক ও কবির আবির্ভাব হয়। সে সময়ের রচনায় বা বাংলা সাহিত্যের আধুনিককরন কালে প্রচুর আরবী, ফার্সী , এবং ইংরেজী শব্দ বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ হিসাবে পরিগনিত হয় । বাংলা ভাষা সে নব জাগরন বা আধুনিকীকরন কালে সংস্কৃত ভাষার চাপিয়ে দেয়া দুর্বোধ্য ব্যাকরন নীতি পরিবর্তন করে বাংলা ভাষার বানান এবং বর্ণ সংস্কার বা সহজী করনে এবং সংস্কৃত ভাষার গোলামী থেকে বাংলা ভাষা কে মুক্তু করনে ১৯২০ সালের দিকে বিশ্বভারতী চলতি ভাষার একটি নিয়ম তৈরী করে । রবীন্দ্র নাথের অনুমোদনক্রমে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অধ্যাপক প্রশান্ত চন্দ্র বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশিত হয় ( প্রবাসী পত্রিকা ১৩৩২ বঙ্গাব্দ)।
১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান সংস্কার সমিতি ১৯৩৬ সালের মে মাসে বাংলা সংস্কার সহজীকরন বানান নীতি প্রকাশ করে । অন্ধ সংস্কৃত ভাষা প্রেমিকদের বিরোধীতার মুখে তা বাস্তবায়িত হতে পারেনি ।
১৯৪৯ সালে মাওলানা আকরাম খাঁনের নেতৃত্বে বাংলা বানান সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটির রিপোর্ট ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয়। সেখানেও বাংলা ভাষাকে সহজী করনে সংস্কৃত ভাষা থেকে চাপিয়ে দেয়া দুর্বোধ্য বানান ও বর্ণমালা গুলো বাদ দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয় ।
১৯৬৩ পুনরায় তখনকার বাংলা একাডেমীর পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের নেতেৃত্বে বাংলা বানান ও বর্ণমালা সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। সে কমিটিতে সদস্য ছিলেন- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড.মুহাম্মদ এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন, ইব্রাহিম খাঁ, মুহাম্মদ ফেরদৌস খান, মুনীর চৌধুরী এবং আবুল কাশেম সহ বাংলা ভাষার কালজয়ী ভাষাবিজ্ঞানী বৃন্দ। ১৯৬৭ সালের ২৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্ষদ প্রচুর গবেষনা করে সংস্কৃত ভাষা থেকে চাপিয়ে দেয়া দুর্বোধ্য বর্ণ ও বানান পরিবর্তনের সুপারিশ করে । এবং বর্ণমালা থেকে ঈ, ঊ, ঔ, ঐ ,ঙ ,ঞ ,ণ ,ষ , ঊ-কার বাদ দেয়ার সুপারিশ করে ।
যুক্ত বর্ণে- ব-ফলা, ম-ফলার পরিবর্তে বর্ণদ্বিত্ব গ্রহন এবং জ-য এবং স-শ এর ব্যবহারের জন্য নতুন নিয়ম চালু করেন ।
১৯৪০ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রায় কাছাকছি বানান রীতি প্রবর্তন করে ।
বাংলা একাডেমী বাংলাভাষার বিজ্ঞানীদের মতামত উপেক্ষা করে সংস্কৃতি ভাষা প্রেমের পরিচয় দিচ্ছে ?

মাহমুদুল হাসান নিজামী
লেখক, কবি, গবেষক, ইতিহাসবিদ, ১১২ টি গ্রন্থ প্রনেতা

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.