আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল “সার্বজনীন মানবাধিকার বিষয়ক ঘোষণা” (ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস- UDHR) ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশনে ঘোষণা করা হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক এই ঘোষণাটি জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র মেনে চলতে বাধ্য এবং এই ঘোষণাটি সদস্য রাষ্ট্র সমূহের সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে বৈষম্যহীন ভাবে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার হচ্ছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার।

জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র সমূহ এবং আন্তর্জাতিক সকল সংস্থা যেকোন পরিস্থিতিতে দেশ, জাতি, ভাষা, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সকল নাগরিকের জন্য বৈষম্যহীন ভাবে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করতে এবং সকল নাগরিকের মৌলিক এই অধিকার সুনিশ্চিত করতে বাধ্য।

করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রথম থেকেই মানবাধিকারে বিশ্বাসী ও সংবেদনশীল অনেক বিশ্বনেতা’রা “ভ্যাকসিন গ্রহণের ক্ষেত্রে সকলের সমান সুযোগ” নিশ্চিত করার পক্ষে কথা বলেছেন।

বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সারা বিশ্বের সকল দেশের সকল মানুষ যেন ভ্যাকসিন গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পান সেজন্য “COVID-19 Vaccine As a worldwide Common Good” নামের একটি বৈশ্বিক প্রচারণা চালাচ্ছেন।

নোবেলজয়ী বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রিয় তারকা ব্যক্তিত্ব এবং বিশিষ্ট সোশ্যাল এক্টিভিস্ট সহ মোট ১৫৫ জন বিশ্ব বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ইউনূস এর এই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা “অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল” (Amnesty International) এবং আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা “অক্সফাম” (Oxfam) সহ বেশ কিছু অলাভজনক সংগঠন একত্রিত হয়ে “People’s Vaccine Alliance” নামের একটি জোট গঠন করেছে।

ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের ধনী দেশগুলোর মধ্যে ভ্যাকসিন ক্রয় সংক্রান্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে “People’s Vaccine Alliance” জোট সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। উক্ত রিপোর্টে ধনী দেশ গুলোর ভ্যাকসিন কেনা নিয়ে উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে উঠে এসেছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা ফাইজার- বায়োএনটেক এবং মডার্না কোম্পানির সাথে ধনী দেশ গুলো ২০২১ সাল নাগাদ যত ভ্যাকসিন উৎপাদন করা সম্ভব তার প্রায় সব টুকু কিনে নেয়ার জন্য চুক্তি করে ফেলেছে।

এখন পর্যন্ত উৎপাদিত ভ্যাকসিন এর মোট ডোজের মধ্যে মডার্না’র ১০০% (শতভাগ) ডোজ এবং ফাইজার- বায়োএনটেক এর প্রায় ৯৬% শতাংশ ডোজ ধনী দেশগুলো ইতিমধ্যে কিনে নিয়েছে।

একমাত্র অক্সফোর্ড- অ্যাস্ট্রাজেনেকা বলেছে তাদের উৎপাদিত ৬৪% শতাংশ ডোজ তারা উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জন্য সরবরাহ করবে, কিন্তু, উন্নয়নশীল দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যাটি খুবই নগন্য।

যদি তারা ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং সরবরাহের মাত্রা বৃদ্ধি করে, তাহলেও চলতি বছরের শেষ হয়ে আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৮% মানুষকে তারা ভ্যাকসিন প্রদান করতে সক্ষম হবে।

সবচেয়ে ভয়াবহ এবং দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও উৎপাদনের এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও ধনী দেশগুলো তাদের দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি ভ্যাকসিনের ডোজ ইতিমধ্যে কিনে নিয়েছে অথবা, অর্ডার করে রেখেছে।

সবচেয়ে বেশি ডোজ কিনে নিয়েছে কানাডা, তারপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কানাডা যে পরিমাণ ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছে, সেগুলো দিয়ে কানাডা’র প্রত্যেক নাগরিককে ৫ টি ডোজ করে ভ্যাকসিন প্রদান করা যাবে।

আরও পড়তে পারেন:

ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে পরিমাণ ভ্যাকসিন কিনেছে, তা দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর সব গুলো দেশের প্রত্যেক মানুষকে দুই বার করে ভ্যাকসিন প্রদান করা যাবে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত ডাটা অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪% মানুষ এসব ধনী দেশগুলোতে বাস করেন, অথচ, এই ১৪% মানুষ সারা পৃথিবীতে ভ্যাকসিনের মোট চাহিদার ৫৩% ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছেন।

ধনী দেশগুলোর এই নিষ্ঠুর আচরণের কারণে, প্রায় ৭০ টির বেশি উন্নয়নশীল এবং দরিদ্র দেশের মোট জনসংখ্যার প্রতি দশ জন এর মধ্যে মাত্র একজন ভ্যাকসিন পাবেন, বাকি নয় জন ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত এবং পরবর্তী বছরের শুরু নাগাদ কোন ভ্যাকসিন পাবে না বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেকোন বিবেকবান এবং সুস্থ মানসিকতার মানুষের মতো আমিও চাই, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন পৃথিবীর সকল দেশের সকল মানুষের জন্য বৈষম্যহীনভাবে সরবরাহ করা হোক।

শুধুমাত্র ধনী দেশগুলো প্রয়োজনের থেকে বেশি ভ্যাকসিন কুক্ষিগত করে না রেখে, বরং, যেখানে আগে প্রয়োজন সেসব দেশে আক্রান্ত মানুষকে জরুরী ভিত্তিতে সবার আগে ভ্যাকসিন প্রদান করা উচিত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এখনো বিশ্বে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আজ ১১ ই জানুয়ারী ২০২১, রোজ সোমবার এই আর্টিকেল লেখা পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে মোট প্রায় ৯ কোটি ৭ লক্ষ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১৯ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

আসুন আমরা সকলেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের সবার জন্য মাগফেরাত কামনা করি এবং তাদের শোকাহত পরিবার ও আপনজনদের সমবেদনা জানাই। আর বর্তমানে যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন, তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। সৃষ্টিকর্তা সকলের সহায় হোন।

মোস্তাফিজুর রাহমান
বি.এস.সি ইন ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব রোম ‘তর ভেরগাতা’, এম.এস.সি (ক্যান্ডিডেট) ইন ডাটা সায়েন্স, সাপিয়েন্সা ইউনিভার্সিটি অব রোম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব ইতালি এবং বিশেষ প্রতিনিধি, আর্লি-স্টার নিউজ ডট কম।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.