‘মুসা আল হাফিজের মননাবিশ্ব’ ড. মো: রিজাউল ইসলামের ঘোরলাগা ও ঘোর লাগানো একটি বই। একটি মন আর মনের মধ্যকার একটি বিশ্ব সেখানে অঙ্কিত। সেই বিশ্ব আমাদের চেনা বিশ্ব নয়, বদলে যাওয়া ও রূপান্তরিত এক জগত। এ জগতে আছে আশ্চর্য দৃশ্যাবলি। রিজাউল ইসলাম এর নাম দিয়েছেন ‘রহস্যরাজ্য’। সেখানে আছে ‘শহর, নগর, গ্রাম, অরণ্য সমুদ্র, নদী, নক্ষত্র, বৃক্ষ, তরুলতা, রোদ-বৃষ্টি, চন্দ্র-সূর্য, মানুষ, পশু-পাখি সবই।’ এগুলোর স্বরূপ চিহ্নিত করেছেন তিনি এক কথায়-‘যা বাস্তব হয়েও বাস্তবের অধিক আবার কল্পনা হয়েও বাস্তব।’ যারা সেই জগতের স্বাদের সাথে পরিচিত, রিজাউল এর ভাষায়-তারা ‘রহস্যরাজ্যের’ নাগরিক হয়ে যান।’

আমরা সেই বিশ্বে একবার পর্যটন করতে পারি। যারাই পর্যটন করবেন, অবাক দৃশ্যাবলির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করুন। আবার মনে রাখুন দৃশ্যগুলো বিস্ময়কর হলেও এর মর্ম ও রহস্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা প্রবেশ করতে পারি একটি কবিতার ভেতর। কবিতার নাম ‘আজ রাতে তারাগুলো’। এখানে কী দেখছি? ‘তারাগুলো ঝুলে পড়েছে পৃথিবীর তারার বলয়ে’, ‘মর্ত্যের চাঁদের টানে বেসামাল চাঁদের হৃদয়’ ‘হরিৎ উপত্যকায় বাতাস মাতিয়ে তোলা স্বপ্ননীল কস্তুরিহরিণ’  ‘ডানা মেলা এক ঝাঁক অলৌকিক পাখি’ তারা ‘দ্রাবিড় দিগন্ত থেকে আত্মার সোনাদানা খুঁটে খায়’ ‘মধ্যরাতে জেগে থাকা জনপদের নক্ষত্রের কাছে রাখে তারা হার্দিক অভিবাদন’, ‘বৃক্ষগুলো কক্ষপথে নক্ষত্রের সহগামী’, ‘অজানা রহস্যে ঢাকা পড়ে যায় সবুজ পত্রপল্লব’। এদিকে ‘নিসর্গের শিরাতন্ত্রীগুলো অপার্থিব ঢেউ তুলেছে’ আর ‘পৃথিবীর চাঁদ-তারাগুলো উদয়াস্তে জ্বালিয়েছে মুগ্ধমনলেলিহান।’

দেখলেন তো! একটি দৃশ্যও বাস্তব নয়। কিন্তু সবগুলোর মর্ম ও তাৎপর্য বাস্তব এবং এর ভেতরে নিহিত দর্শন ও ভাবনারাজি বাস্তব। দৃশ্যগুলোর ভেতরের সেই মর্ম, দর্শন ও ভাবনারাজি উন্মোচন সহজ কাজ নয়। গভীর অনুধাবন ও শিল্পদৃষ্টি দিয়েই সেটা করতে হয়। সে কাজেই এগিয়ে এসেছেন মো. রিজাউল ইসলাম। তার নিষ্ঠাবান পরিশ্রমের স্বর্ণফসল ‘মুসা আল হাফিজের মননবিশ্ব’। বইটির স্বাদু ভাষা মোহময় ভঙ্গিতে বার বার প্রলুব্ধ করে মুসা আল হাফিজের জগত পর্যটনে। বইটি সেই জগতে প্রবেশদ্বারের চাবি তুলে দেয় পাঠকের হাতে। পাঠক যতই সেখানে ঘুরবেন, ছুটবেন, বুদ হবেন, নিজেকে হারাবেন, ততই রিজাউলের প্রজ্ঞা ও বিশ্লেষণকে অনুধাবন করবেন। আমরা তাই আরেকবার কবির কবিতায় প্রবেশ করি। একটি কবিতাকে ধরে অগ্রসর হই। কবিতার নাম ‘মহাবিশ্বের করতালি’। দেখি ও দেখাই কিছু দৃশ্য:

১.      দৃষ্টির প্রভা বিমুগ্ধ বৃষ্টি ঝরায় স্নেহের সৌরলোকে …

    চোখের মৃত্তিকা নড়লেই

উল্লাসে মেতে উঠে নিসর্গের বিশাল তৃণাঞ্চল।

২.     কিছু পুস্প লুট ও রিক্ততার দীঘল বসতিকে

ছুঁড়ে মারছে উর্ধ্বপানে,

ঠিকরে পড়া অশ্রান্ত প্রশ্নের স্পর্ধায়

মত্ত বৈশাখে ধুলো গুড়া ঘুর্ণির চুল্লিতে পুড়ানো স্বপ্নের

করতালে বলছে-হাহাশ্বাসে তড়পানো মানুষের পাজরে

পা রেখে হায়ান কারুন কেন

 শিখরের নিকট চড়বে প্রভু?

৩.     বৃষ্টিধারা আদিম উপত্যকায় ধৃষ্টের সাথে হাড্ডাহাড্ডিতে

জিতে পূণরোত্থানের পতাকা হাতে আসছেন

শস্যের প্রতিবেশে। প্রান্তর মাথা তুলো

মেরুদণ্ড প্রদর্শনের বাজছে নাকাড়া।

৪.     মিসকলে জাগে ঘুমন্ত শহর লাস্যে

তার তুষারশতাব্দী। দিক-দিগন্তে ভেঙে পড়ে।

                   …       …       …

          তুষারের গলগল রক্তে বিদগ্ধ সন্ধ্যার প্রণয় ভেঙ্গে যাচ্ছে দ্রাক্ষাবনে।

৫.     পশমের হিজলবনে মগ্নগীত জ্যোৎস্না, আকাশ বিহঙ্গের

খুড়িয়ে চলা রক্তাক্ত ডানায় গোখরোর দাঁতের দাগে

অকম্মাৎ আঁতকে উঠে …

আকাশে মেঘের চিতা নড়ে আর জেরুজালেমের বুকে

দৌঁড়ায় বিভৎস কুড়াল।

৬.     যখন বীজের জিভে সুর্যের দুগ্ধ ঢেলে ছন্দসিক্ত আলের

দু’কাঠ দিয়ে বয়ে গেল চাষী, তুখুড় কবুতরগুলো তখনই

জানা ঝাড়ে ডাকাতের চালে, তখনই কিচকিরি দিয়ে

চুলের বিলাপ ঠেলে মগজের মাখন উঠে ভাতের থালায়।

৭.     হে তুমি উজ্জ্বল উজ্জ্বল উজ্জ্বল ঔজ্জ্বল্য। নৃত্যরত পর্বতে দেখো

সুন্দরের মৌজ-সে আমার আত্মার উৎসব।

পর্বতের একেক কণা মুক্তফুলের পাঁপড়ি

রৌদ্রঝড়বৃষ্টিসন্ধ প্রকৃতির চোখ, সহস্র উষার দীপ্তি

লুকিয়ে আছে তার অতলে

অনেক কিছুই দেখা গেলো। এক বৃষ্টির কথাই ধরুন। কত বিচিত্র বৃষ্টি। ‘দৃষ্টির প্রভা থেকে ‘বিমুগ্ধ বৃষ্টি’ ঝরছে ‘স্নেহের সৌরলোকে’। বৃষ্টির একেক ফোটা একেকটি চোখ। তার অভিমুখ মৃত্তিকার দিকে। তার চোখের ইশারায় মৃত্তিকা নড়ে। সাথে সাথে বিসর্গের বিশাল তৃণাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে উল্লাস। ‘উল্লাস’ মানে কি শুদ্ধির আবেগ পরিবর্তন কিংবা প্রাণের জাগরণ? ‘তৃণাঞ্চল’ কী গণস্তর, আমজনতা, বিশ্বমানব? ‘বৃষ্টির বর্ষণ’ কি প্রাণশক্তি, প্রেরণা আদর্শিকতা, কিংবা ঐশীসত্য? ‘স্নেহের সৌরলোক’ কি প্রেমময় নতুন পৃথিবীর ইঙ্গিত? ‘দৃষ্টির প্রভা’ কি মানবিক ঐশ্বর্য, অর্ন্তদৃষ্টি, বিবেকের আলো বা মানবীয় দর্শন?-এতো সব জিজ্ঞাস্য বিষয় আপনাকে দৃশ্যের উপরতলা থেকে ভাবনার নিচতলায় নিয়ে যাবে।

আবার দেখুন: ‘বৃষ্টিধারা আদিম উপত্যকায় ধৃষ্টের সাথে ‘হাড্ডাহাড্ডিতে’ লিপ্ত। ‘বৃষ্টি’ এক শক্তির প্রতীক, ‘ধৃষ্ঠ’ আরেক শক্তির প্রতীক। উভয়কে শরীরী ভাবতে পারেন আবার অশরীরীও ভাবতে পারেন। ‘হাড্ডাহাড্ডিতে’ বৃষ্টির জয় হলো। তারপর সে ‘পূণরোত্থানের পতাকা হাতে আসছেন শস্যের প্রতিবেশে। প্রান্তরকে আহবান করা হচ্ছে মাথা তুলতে। কারণ বৃষ্টির বিজয়ে মেরুদণ্ড প্রদর্শনের নাকাড়া বাজতে শুরু করেছে। কবি বলছেন:

এবার বৃষ্টি নামবে, গর্ভউদ্ভিদেরা হাতমুখ ধুয়ে রাখো

বিক্ষোভের কাল সমুপস্থিত।

(মহাবিশ্বের করতালি)

প্রকৃতি ও মানবমনে কবি দেখেন বৃষ্টিবরণের পিপাসা:

এখানে ক্ষুধার সাপ নড়ে উঠে রক্তে-চোরাটানে

তার পাশে ঘাসে ঘাসে সুতুমুল বৃষ্টির আশ্বাস

সৌরজল মাতিয়ে তোলা আদিপৃথিবীর মাছ

অগাধ হৃদয়ে খুজে মুক্তির শ্বাস

(মহাবিশ্বের করতালি)

আবার নিজেকে ও মানবসত্তাকেও তিনি দেখেছেন ‘বৃষ্টির কণা’ হিসেবে। ‘অস্তিত্ব ঘোষণা’ করে যা আকাশের দিকে উড়ে যায় আবার নেমে আসে ‘উদগমের জলধারা’ হয়ে। তার ভাষায়:

তুমি আমি মোতি-সুতা, ছায়াপথ – নক্ষত্রের মতো

মানবসমুদ্রে লীন বৃষ্টির কণা। অস্তিত্ব ঘোষণা করে

প্রাণোচ্ছল উড়ে যাবো আবারো আকাশে

মিকাইল হেকে হেকে কিষাণের স্বপ্ন জুড়ে

বর্ষাবেন উদগমের জলধারা

হায়েনাও ভিজে যাবে ঘোর বরিষণে

আমাদের ধর্ম ঠিক ফসলের মতো, মানবতা তার শষ্যমাঠ

(মহাবিশ্বের করতালি)

তাহলে এখানে ‘বৃষ্টি’ বিবিধ অর্থসম্ভাব্যতায় অন্তঃসত্তা। দৃষ্টান্তগুলো আনা হয়েছে কেবল ‘মহাবিশ্বের করতালি’ কবিতা থেকে। তার অন্যান্য কবিতায় ‘বৃষ্টি’ যেসব রঙ, রূপ ও প্রকৃতি ধারণ করে, তা দীর্ঘ এক আলোচনার বিষয়।

রিজাউল ইসলাম মুসা আল হাফিজের ‘আমি’ ‘তুমি’ ‘মদ’ ‘নদী’ ‘আকাশ’ ‘সবুজ’ ‘ জ্যোৎস্না’ ‘চাঁদ’ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এতে ধরা পড়েছে মুসা আল হাফিজের মানসপ্রকৃতি এবং চিন্তার বহুতল। প্রাকৃতিক এসব উপাদান অন্য যে কোন কবিতে উপস্থিত। কিন্তু মুসা তার উপাদানগুলিতে বহু তাৎপর্য যোজনা করেন। বহু রহস্য ও অর্থবিস্তার নিশ্চিত করেন। রিজাউল ইসলাম ঠিকই লিখেছেন:

‘মুসা আল হাফিজের অধিকাংশ কবিতার অর্থ দ্ব্যর্থবোধক, নির্দিষ্ট কোনো অর্থে কাব্যচিন্তার ব্যস সীমায়িত করা যায় না। তবু অর্থব্যঞ্জনাকে ছাপিয়ে কেন্দ্রিকতা যে নেই সেটা বলা যাবে না। পরাবাস্তবতার বিলাসী পোশাক সে কেন্দ্রমুখকে দ্বিধান্বিত করে। (রিজাউল, ২০১৮)

তাঁর এই প্রবণতা যখন প্রকৃতিচিত্রে প্রকাশিত হয়, তখন তাঁর ‘বৃষ্টি’ ‘নদী’ ‘চাঁদ’ ‘পাহাড়’ ‘সাগর’ ‘পাখি’ ইত্যাদি আমাদের চেনা জগতের সীমানায় থেকেও চেনাজগত পেরিয়ে যায়। এ সব উপাদান হয়ে উঠে একেক বক্তব্যের প্রতীক। তার প্রকৃতি হয়ে উঠে একান্তই তার মতো। রিজাউল ইসলামের ভাষায়:

প্রকৃতি মুসা আল হাফিজের কবিতার একটি প্রধান অনুষঙ্গ। প্রকৃতির ভেতর দিয়ে তিনি জীবনকে দেখেন। প্রকৃতি তার কবিতার শরীরে যুক্ত। নিসর্গলিপ্ততা, প্রকৃতি সচেতনতা এবং পরিবেশ চিত্রণে তার কবিতা আলদামাত্রা পেয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতর সমন্বয় ঘটিয়েছেন। (রিজাউল, ২০১৮)

কখনো ‘বাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার সমন্বয়’কখনো ‘পরাবাস্তবতার বিলাসী পোশাক’ থাকে তার উপাদানে। ফলত তার ছবিগুলো সালভাদর ডালির ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। ডালির চিত্রে দেখা যায় একটি জিরাফ আগুনের মধ্যে। একটি পানির পাত্র একখণ্ড পনিরে পরিণত হয়েছে। একটি পাথর মানুষে পরিণত হয়েছে। ডালির একটি চিত্রের নাম মেটামরফোসিস-অব-নার্সিসাস।

মেটামরফোসিস মানে আকারের পরিবর্তন। চিত্রটিতে দেখা যায় সব কিছুই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যে হাতটি ডিম ধরে রেখেছে, তা পাথরে পরিণত, পিঁপড়া তার উপর দিয়ে চলাফেরা করছে, ডানদিকের দাবার ছকটি শহরের স্কোরারে পরিণত। এমনকি নদীর পানি কাচে পরিণত হয়েছে। আর মুসা আল হাফিজের মননবিশ্বে হিমালয় তাজমহলে পরিণত হয়, তাজমহল শস্যক্ষেত হয়ে হাঁটে, আবার সূর্যের সুরমা হয়ে সমুদ্রের চোখে লেগে রয়-

আমি তো প্রার্থনায় গলছি

একবার হিমালয় ভেঙে হচ্ছি তাজমহল, হাঁটছি বুকভর্তি ধানের দাপটে

উড়ছে শিল্পের বোধগম্য ধুলো, আমি তো

সূর্যের সুরমা, সমুদ্রের চোখে এলাম অস্তিত্বের

দু’ফোটা রেখে-

বাহবা সমুদ্র! এতো মউজ কখনো দেখিনি তার

(মহাবিশ্বের করতালি: ঈভের হৃদের মাছ)

মুসা আল হাফিজের এই বিচিত্র বিশ্বের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব মো. রিজাউল ইসলামের।

(লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.