বনানী, ঢাকার ডেলকট লিমিটেডের পক্ষ থেকে ফ্যামিলি ট্যুরে গিয়েছিলাম বান্দরবানে। তিনদিনের সফরের তৃতীয় দিন নির্ধারিত ছিলো নীলগিরি ভ্রমণ। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল শুক্রবার, ২০১৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। বান্দরবান শহরের হোটেল হিল ভিউ থেকে আমরা ৪৪ জনের একটি টিম ভোর ৬ টায় রওয়ানা হলাম মেঘ পাহারের স্বর্গ রাজ্য নীলগিরির উদ্দেশ্যে। বান্দরবান শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দুরে থানচি উপজেলায় অবস্থিত নীলগিরি যেতে হলে আমাদের পাহাড়ী উঁচু নিচু রাস্তা বেয়ে উঠতে হবে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৪০০ ফিট উচ্চতায়। তাই আমাদের সবার মাঝেই এক চমৎকার উত্তেজনা বিরাজ করছিল যা ফুটে উঠেছিল সবার চোখে মুখে।

নীলগিরি ভ্রমণে আমরা চান্দের গাড়ি বলে খ্যাত তিনটি খোলা জিপ ৪০০০ টাকা করে ভাড়া নিয়ে ছুটছিলাম। তখন প্রচন্ড শীতে আমাদের সবার অবস্থা জড়সড়। কিছুদুর এগিয়ে আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠার পর মনে হলো সবাই যেন মেঘের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আর মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের। সে এক অন্য রকম অনুভুতি! হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার জ্যাকেট বেয়ে পানি ঝড়ছে। পাশে বসা আমার কলিগ সঞ্জীব দা’কে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, মেঘ আপনাকে ভিজিয়ে দিয়েছে রাজিব ভাই। খেয়াল করলাম, নীল রঙের সানগ্লাসটিও ভিজে গেছে। কয়েক কিলোমিটার যাবার পর চোখে পড়লো শৈল প্রপাত, চিম্বুক পর্বত। উপজাতিদের হাতে তৈরী শাল, হরেক রকমের ফলও পেয়ে গেলাম রাস্তায়।

ততক্ষণে প্রায় নীলগিরি যাত্রাপথের অর্ধেক পথ চলে এসেছি। দেখতে পাচ্ছি সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছে। মহান সৃষ্টিকর্তার কি অনবদ্য সৃষ্টি! আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া আদায় করছি এরকম একটি অপরুপ দৃশ্য দেখার সৌভাগ‍্য হয়েছে বলে। আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে নীলগিরির পথে। নানা ধরনের চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে আমাদের সফরকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত করেছিল ইসহাক (গাড়ির হেলপার)। যাওয়ার পথে দেখতে পেলাম উপজাতি মহিলাদের। কাঁধে সুন্দর একটি ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। নারিকেল, কলা, পেপের মত বিভিন্ন ধরণের পরিচিত গাছের পাশাপাশি দেখতে পাচ্ছিলাম অসংখ‍্য অপরিচিত গাছ । ইতিমধ্যে আমরা চলে এসেছি নীলগিরি প্রবেশ চেকপোস্টের কাছে।

উল্লেখ‍্য, নীলগিরি রিসোর্ট বাংলাদেশ সেনা বাহিনী পরিচালিত একটি রিসোর্ট। তাই ওখানে যেতে হলে যাত্রীদের নাম এন্ট্রি করে তারপর অনুমতি নিয়ে যেতে হয়।

তখন সকাল প্রায় আটটা। আমরা এবার নীলগিরির বেশ কাছাকাছি। পাহাড়ের গা ঘেষে পিচ-ঢালা মসৃণ পথে এগিয়ে চলছি শুভ্র মেঘকে নিচে ফেলে। কখনো ওপরের দিকে উঠতে হচ্ছে, আবার কখনও নিচের দিকে নামতে হচ্ছে। তখন বার বার মনে পড়ছিল ২০০৯ সালে দার্জিলিং সফরের কথা। ঐ যাত্রাপথও এরকমই ছিলো।

এবার আমরা সবাই দলগত ভাবে গান গাচ্ছি। দারুন উত্তেজনায় উন্মুখ আমরা! কাম ট্যুরিস্ট গাইড ইসহাক (গাড়ির হেলপার) বললো, ঐ যে দেখুন নীলগিরি দেখা যাচ্ছে। সবাই তার কথা শুনে গাড়ির ভেতরেই দাঁড়িয়ে গেলাম। হ্যাঁ সত্যিই আমরা নীলগিরির একেবারে সন্নিকটে। সবাই ক্যামেরায়, মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে তুলতে টের পেলাম আমাদের গাড়ি থেমে গেছে। ওহ তার মানে আমরা এখন নীলগিড়ি হিল রিসোর্টের গাড়ি রাখার পার্কিংয়ে! আমার পাশে বসা ডেভিড ভাইকে সাথে নিয়ে নীলগিরির মাটিতে পা রাখলাম। ঠাণ্ডার সমস্যার কারণে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশে বসা ছিলো আমার স্ত্রী তানিয়া ও মেয়ে জায়না। ওদেরকেও নামালাম। নেমেই বুক ভরে মেঘ, পাহাড় আর সবুজের সংমিশ্রনে তৈরী বাতাসের নির্ভেজাল ও প্রাকৃতিক এক জুস গ্রহন করলাম।

ওহ! সত্যিই এত সুন্দর জায়গা বাংলাদেশে আছে! ইংরেজিতে ওয়াও শব্দটি সবার মুখ থেকেই তখন বের হচ্ছিল। আমাদের আইটি অফিসার সাইদুর তো রীতিমত ওয়াও, চার্মিং, মারভেলাস, ওয়ান্ডারফুল এসব বলেই যাচ্ছে। নীলগিরি পৌঁছুতে সময় লাগলো প্রায় দু’ঘন্টা। এবার সকালের নাস্তাটা সাড়তে হবে। আমরা বান্দরবান থেকে প্যাকেট নাশতা নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাল, ডিম,পরোটা আর চা দিয়ে নাস্তা শেষ করলাম সবাই।

এরপর ফটোসেশনের পালা। ৫০ টাকার প্রবেশ টিকেট কেটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখতে পেলাম মেঘের সমুদ্র এখন আমাদের চোখের সামনে। এত সুন্দর দৃশ্য আমি এর আগে কখনও উপভোগ করিনি! সাদা মেঘগুলো যেন বরফের কোন পাহাড় মনে হচ্ছিল। সাদা তুলার মত লাগছিলো মেঘের সমুদ্রকে। ইচ্ছে হচ্ছিলো, ব্যাগ ভরে ঢাকায় নিয়ে যাই। নীলগিরি নাম শুনে হয়তো ভাবতে পারেন জায়গাটির নামই নীলগিরি, প্রকৃতপক্ষে তা নয়। মুলত এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে পরিচালিত একটি হিল রিসোর্ট, যার নাম নীলগিরি হিল রিসোর্ট। এই রিসোর্টে পাঁচ ধরণের কটেজ আছে। আকাশনীলা, মেঘদুত, নীলাঞ্জনা, মারমা রিসা, তেহখো এবং সাথে আছে তাবু টানানো ঘর।

কটেজগুলোর যে কোন একটিতে এক রাত্রির জন্য ভাড়া পড়বে ৫০০০ থেকে ১২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর তাবুতে খরচ হবে ২৫০০ টাকা। বাংলাদেশী পর্যটকদের রিসোর্ট বুকিং দিতে হলে বাংলাদেশ আর্মির কোন অফিসারের সাথে পরিচয় থাকতে হবে। তারপর অনলাইনে ফরম পূরন করে বুকিং দিতে হবে। বিদেশী পর্যটকদের জন্য এই রিসোর্টটি রেস্ট্রিকটেড বা নিয়ন্ত্রিত। এখানে রয়েছে একটি উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট, আছে হেলিপ্যাড। এখানে বছরের বেশিরভাগ সময়ে মেঘ দেখা যায়। তবে বর্ষাকালে নীলগিরির রূপ হয় ব‍্যতিক্রম। তখন তার সৌন্দর্য বহুগুন বেড়ে যায়। আমরা নীলগিরির মনকাড়া স্থানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর ছবি তুলছিলাম। এখানে আসার পর আমার মনে হলো দার্জিলিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর আমাদের নীলগিরি।

যারা এখনো যাননি তারা একবার ঘুরে আসতে পারেন পরিবার নিয়ে। আমার মনে হয়, ওখানে যে কেউ একবার গেলে আবার যেতে চাইবেন। আমার বিশ্বাস সরকার ও সেনাবাহিনীর বিশেষ উদ্যোগে এই অপূর্ব মনোরম সুন্দর স্থানটি একসময় বিশ্বের অন্যতম ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষন করবে। প্রায় দু’ঘন্টা অবস্থান শেষে এবার আমাদের ফেরার পালা। মেঘ পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে আবার ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম বান্দরবান শহরের উদ্দেশ্যে। আর কানে কানে নীলগিরিকে বললাম, বন্ধু খুব তাড়াতাড়ি তোমার সাথে আবার দেখা হবে।

অলিউর রহমান খান
কবি, লেখক, আবৃত্তিকার, সৌখিন ফটোগ্রাফার।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.