আমরা আজ দাঁড়িয়ে এক স্বাধীন বাঙালি সত্তার উপর। দাঁড়িয়ে আছি এক স্বকীয়তার আঙিনায়। সার্বভৌমত্ব মাখি সারা অঙ্গে। এই স্বাধীন বাঙালি সত্তা; স্বকীয়তার উঠোন; সার্বভৌমত্বের ব্যঞ্জনা এসেছে সুদূর এক স্মরণীয় পথ পেরিয়ে। এসেছে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া এক ত্যাগের মাধ্যমে।

কত মা তার মানিকের পথপানে চেয়ে কেঁদে কেঁদে আঁখিজলে ভাসিয়েছিল বক্ষ। কত বাবা তার প্রাণাধিক বংশধরকে প্রাণহীন সাজিয়ে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে সমাধিস্থলে পাথর হয়ে সমাহিত করেছিল। কত নারী তার ভাগ্যে বরণ করে নিয়েছিল নবৌঢ়া বিধবার তকমা। আকাশ, বাতাস, মৃত্তিকা, গাছপালা, পশু-পাখি অনেকেই সাক্ষী অত্যাচারের স্টীমরোলারের।

আমরা কি পারি যেতে ভুলে সেইসকল নিষ্কলুষ মানুষদের অবদান? কিংবা নয়নের জল? অথবা উদ্দাম যৌবনের নিঃশর্ত বলিদান? অবশ্যই পারি না। কেননা আমরা তাদেরই দেয়া দেশে; তাদেরই বানানো বেশে; তাদেরই কর্ষিত জমিনের উৎপাদিত ফসল খেয়ে আছি। চলছি সদর্পে। বুক ফুলিয়ে বলছি আমি বাঙালি। আমি অধিকারী হাজার বছরের এক স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত ঐতিহ্যের। আমি বাংলাভাষী। আমিই একমাত্র উত্তরাধিকারী ভাষার জন্য প্রাণদানের মর্যাদার।

উপর্যুক্ত কথাগুলি যিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদের শেকড় জানার পথ বাতলিয়ে দিলেন তিনিই হলেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৪ – ১৯ মার্চ, ২০০১)। বিগত শতকের মধ্য দশকের একজন মৌলিক কবি। স্বল্পপ্রজ এই কবি ও প্রাবন্ধিকের পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ খান।

তাঁর দুটি দীর্ঘ কবিতা ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ এবং ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অভূতপূর্ব সংযোজন। যে কয়েকটি দীর্ঘ কবিতা বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রতিনিধিত্বকারী তন্মধ্যে ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ কবিতাটি অন্যতম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে ১৯৫৮ সালে Later Poems of Yeats: The Influence of Upanishads বিষয়ে গবেষণা করেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের শুরু। এরপর পাবলিক সার্ভিস কমিশনে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা হিশেবে নিয়োগ পান। ১৯৮২ সালে তিনি তৎকালীন এরশাদ সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মার্কিনমুলুকেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

দু’ধরণের কবিতা বুননে তাঁর হাত সমানভাবে পারঙ্গমতা অর্জন করেছিল। একপ্রকার গীতিকবিতা ও অন্যপ্রকার মহাকাব্যিক দীর্ঘ কবিতা। দেশ, দেশের মানুষ, জাতীয় চেতনা, ঐতিহ্যের স্মরণ, প্রেরণার উচ্চারণ, কৃষকের লাঙ্গলের কর্ষণ ইত্যাদি তাঁর কাব্যকে করেছে অনন্য। তিনি এই অনন্য বিষয়গুলি নিজ কাব্যের জমিনে চাষ করে নিজেকে এক শেকড় সন্ধানী কবি হিসেবে প্রমাণ করেছেন। আর যা তাঁর কাব্যকে করেছে শ্লাঘ্য।

তাই তাকে সম্মানে সম্মানিত করার জন্য বাংলা একাডেমি ১৯৭৯ সালে সাহিত্য পদকে ভূষিত করে। এছাড়াও রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত হন ১৯৮৫ সালে।

চৌম্বকীয় সাহিত্য রচনায় পারদর্শী আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ যে কয়েকটি সাড়াজাগানো কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন সেগুলি হচ্ছে, সাতনরী হার (১৯৫৫), কখনো রং কখনো সুর (১৯৭০), কমলের চোখ (১৯৭৪), আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি (১৯৮১), সহিষ্ণু প্রতীক্ষা (১৯৮২), প্রেমের কবিতা (১৯৮২), বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা (১৯৮৩), আমার সময় (১৯৮৭), নির্বাচিত কবিতা (১৯৯১), আমার সকল কথা (১৯৯৩), মসৃণ কৃষ্ণ গোলাপ প্রভৃতি।

তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী গ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, চীনের কমিউনিজম সম্পর্কে Yellow Sands’ Hills: China through Chinese Eyes; বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন সম্পর্কে Rural Development: Problems and Prospects; (Tom Hexner-এর সঙ্গে যৌথভাবে); Creative Development; Food and Faith।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহকে যে কবিতাটি বাংলাসাহিত্যাঙ্গনে অমর করে রেখেছে সেটি তাঁর ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ শীর্ষক কবিতা। কবিতাটি কবির ১৯৮১ সালে প্রকাশিত ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ নামক কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা। বাংলা হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করেছে এই কবিতাটি।

কবিতাটি একটি দর্পণ, যার সম্মুখে দাঁড়ালে আমরা লহমায় পৌঁছে যাই আমাদের শেকড়ে। শেকড় থেকে ক্রমান্বয়ে নেমে আসি আজকের যুগে। গঠনাকৃতিতে ছত্রগুলি তৎসমের কাব্যের প্রতিকৃতি। ভৌতিক কোন কিছুকে তিনি তাঁর কাব্যের নায়ক করে তুলে ধরেননি। তুলে ধরেছেন বাংলার সূর্যসন্তানদের। তাদের কৃতি স্মরণ করিয়ে বলেছেন, আমাদের উৎস তাঁরাই।

আমাদের পূর্বপুরুষগণ কবিতা বা সংস্কৃতি প্রিয় ছিলেন। আমরা বেনিয়া ছিলাম না। বেনিয়ারা আমাদের জোচ্চুরি করে শাসনক্ষমতা কেড়ে নিয়ে দাসত্ব চাপিয়েছিল। সেই চর্যাপদ, তিতুমীর, শরীয়তউল্লাহ অথবা আমাদের নাম না জানা কোন এক কর্ষণের হাতের নেতা।

গদ্য ভঙ্গিতে লেখা কবিতাটি আমাদের অনার্যদের সংগ্রামমুখর সময় ও প্রেরণার। বাঙালি মুসলিমদের এক উৎকর্ষে পৌঁছার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার আখ্যান কবিতাটি। এখানে একজন বীরপুরুষের কথা বলেছেন কবি। যিনি প্রায় সকল সংগ্রামী বাঙালি সত্তাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

কবিতাটি প্রারম্ভ হয়েছে যে অসাধারণ পঙক্তি দ্বারা তা হচ্ছে,

“আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল।”

সূচনায় বুঝিয়ে দিলেন যে, মহাকাব্যিক কবিতার ভুবনে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি। আর সেই কবিতার পরতে পরতে শব্দে শব্দে আমরা পরিচিত হব, জানব আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা। সেই পূর্বপুরুষগণ ক্যামন ছিলেন? তাও জানাচ্ছেন এভাবে যে, তাঁরা ছিলেন সরল ও আত্নসম্মানবোধ সম্পন্ন কৃষকশ্রেণির মানুষ।

তাঁরা কর্ষণ করত এদেশের জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীর পলিতে প্লাবিত উর্বর ভূমি। এই শ্যামল দেশটি বারবার শখুনির নখরে হয়েছে ক্ষতবিক্ষত। ব্যথায় আড়ষ্ট ছিলো আর তখনি সেই শকুনিরা জেঁকে বসল আমাদের উপর। তাদের আক্রমণ ছিল কাপুরুষোচিত পেছন থেকে।

আমাদের ভেতরকার কিছু ঘর্ষেটি বেগম আর মীর জাফর আলী খানদের আত্নবিধ্বংসী ষড়যন্ত্রের ফলে আমরা হয়েছিলাম প্রজারূপী গোলামে। আমরা হয়েছিলাম পেছন থেকে হামলার শিকার। আমাদের পিঠে তাই দগদগে লাল ক্ষত চিহ্ন। এই রক্তজবার চিহ্ন দাসত্বের। আমাদের উপর চলা চাবুকের আঘাতের। আমরা সহজে আজকে এই পর্যায়ে আসিনি।

আমাদের দেশে একসময় বিনোদনের মাধ্যম ছিল কবিতা শোনা। তাছাড়া হাজার বছরের এই অঞ্চলের ইতিহাসে রাজদরবারে থাকতেন একজন কবি। অন্যান্য স্থানেও কবি থাকতেন। তাঁরা দরবারে নানা উপলক্ষে কবিতা বলতেন। শিল্পিত মতির অধিকারী বাদশাহ নান্দনিক কাব্য শ্রবণে খুশি হয়ে কবিকে তাৎক্ষনিক মোহর বা গ্রীবা থেকে মাল্য খুলে উপহার দিতেন।

আরো পড়তে পারেন:

তার অর্থ কবিতা আমাদের সবখানেই জড়িত। কবিতা তো তাই যা মানুষ বলে। কবিতা তো তাই যা মানুষ ধারণ করে চলে। তবে কবিতা তা নয় যা মিথ্যে। যা মরীচিকা। যা শুণ্ডের বাহন। কবিতাকে কেউ কলঙ্কিত করলে সেই নরপাপীর জন্য সেই কর্মের দায়। এর দায় কখনো কবিতার নয়। দায় তার লোলুপতার। দায় তার স্বার্থান্বেষণের। এই স্বার্থান্বেষীরা পাবে না কাব্যের স্বাদ।

তাই তারা আজীবন বন্দি থাকবে তাদের লালসার কাছে। পারবে না উপভোগ করতে দিগন্তের নীলিমা। ঝরনাধারার নিষ্কলুষতা। পৃথিবীর সবকিছুতে আছে ছন্দ। আছে মিল। আছে ব্যঞ্জনা। তাই কৃষকের ঘামঝরা ফসলের প্রত্যেকটি দানাও কবিতা। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লিখছেন,

“তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা,
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।
আমি উচ্চারিত সত্যের মতো
স্বপ্নের কথা বলছি।”
(আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি)

একটি ফুটফুটে শিশু স্কুলে যায়। বাউল মুক্তকণ্ঠে গান গায়। মুঠে মজুর আপন জীবিকায় ধায়। মায়েরা ছেলেকে আর হারাতে ভয় পায় না কোন বিদেশীয় হামলার দ্বারা। সীমানা আজ নির্ধারিত। এসব আমরা পেয়েছি এক অবর্ণনীয় ত্যাগের বিনিময়ে। দীর্ঘদিন রক্তের ধারা প্রবাহিতের মাধ্যমে। কোন রক্তচক্ষুকে ভয় করে চুপসে না যাওয়ার পরিণতির বিনিময়ে।

ছোট্ট একটি পিঠে অসংখ্য কষাঘাতের চিহ্নের বিনিময়ে। দেশীয় শোসকদের, উৎপীড়কদের বিরুদ্ধে বজ্রমুষ্টি উত্তোলিত করে দাবি আদায়ের স্লোগানের বিনিময়ে। অথবা বত্রিশটি নাড়িছেঁড়া ধনের ফেরাহীন পথপানে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জননীর হাহাকারের বিনিময়ে। কবি যেমনটি বলছেন,

“আমি জলোচ্ছ্বাসের মত
অভ্যূত্থানের কথা বলছি
উত্ক্ষিপ্ত নক্ষত্রের মত
কমলের চোখের কথা বলছি
প্রস্ফুটিত পুষ্পের মত
সহস্র ক্ষতের কথা বলছি
আমি নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননীর কথা বলছি
আমি বহ্নমান মৃত্যু
এবং স্বাধীনতার কথা বলছি।”
(আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি)

দীর্ঘ এই যে মহাকাব্যিক কবিতা। এই কবিতা কাকে উদ্দেশ্য করে রচনা করা? কাকে উদ্দেশ্য করে স্তুতি ও ইতিহাস তুলে ধরা? উত্তর স্পষ্টত একটাই। আমরা বা কবির পরবর্তী প্রজন্ম। কারণ তাদের জানার প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে নিজেকে উদ্দীপিত-উজ্জীবিত করার আখ্যানের।

মায়ের বা দেশ মাতৃকার লজ্জার ভূষণ লুণ্ঠিত হয়েছে বর্গীদের দ্বারা। বোনেরা সম্ভ্রম হারিয়ে লজ্জানিয়ে তাদের দ্বারা হয়েছে হত। যুদ্ধের দামামায় অগ্নিপুরুষ ভায়েদের কথা স্মরণ করো। স্মরণ করো, সেই মহৎপুরুষ সেনানীদের যারা স্বাধীনতার কবিতার অমর কবি। সাহস দেখানো শেখো ঐ অকুতোভয়দের থেকে। পারবে কি দেখাতে এমন সাহস? তাই, ইতিহাস-ঐতিহ্যে পুষ্ট প্রজন্মকে ডেকে বলছেন,

“দীর্ঘদেহ পুত্রগণ
আমি তোমাদের বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি
বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি
আমি আমার ভালবাসার কথা বলছি।
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।
সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।
আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো
আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো ?”

সম্পূর্ণ কবিতায় কবি আবহমান বাংলা আর বাঙালি জাতির কথা, নিজেদের জাতীয় রাষ্ট্রের উৎসের কথা বলেছেন। নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আন্দোলিত মানুষের সামষ্টিক চেতনাকে নানা বর্ণের ছবি দিয়ে সাজিয়ে তুলেছেন। গদ্য কবিতার এক নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়েছে এই কবিতায়। আবৃত্তি শুনলে মনে বিদ্রোহের স্ফুরণ জাগে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.