বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিল্লাল হোসেন মিলন। স্বাভাবিক ভারসাম্যহীন মিলন দুষ্টমিতে মাতিয়ে রাখেন পাড়া-প্রতিবেশীসহ স্বজনদের। তার দুস্টুমি অনেকেই স্বাভাবিক ভাবে নিলেও কিছু লোক তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। এতে তার স্বাভাবিক জীবন-যাপন কিছুটা বাধার সম্মুখীন হয়।

মোহাম্মদ আদনান মামুন, নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাড়ির পাশে খেলারত অবস্থায় মিলনকে অনেকটা খামখেয়ালীতেই জলন্ত চুলা থেকে লাকড়ী দিয়ে ডান হাত ঝলসে দিয়েছেন এক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁর এমন কান্ডে ক্ষুব্দ হয়েছেন স্থানীয়রা।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নিজমাওনা গ্রামে গত সোমবার দুপুরে এমন ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত মাইন উদ্দিন শ্রীপুর উপজেলার নগরহাওলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সে নিজ মাওনা গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে।

ভুক্তভোগী বিল্লাল হোসেন মিলন (১০) নিজমাওনা গ্রামের মোঃ বুলবুলের ছেলে। সে ছোটকাল থেকেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি ও স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারে না।

ভুক্তভোগীর মা মোছা: নাছিমা আক্তার জানান, উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নিজ মাওনা কালারবাড়ী মোড়ের পাশেই গত সোমবার দুপুরে বাড়ির নির্মাণ কাজ করছিলেন অভিযুক্ত শিক্ষক মাইন উদ্দিন। এসময় শিক্ষকের প্রতিবেশী বুদ্ধি প্রতিবন্ধি বিল্লাল হোসেন, তার নির্মাণকাজ দেখতে যান।

একপর্যায়ে শিক্ষকের বাড়ীর পাশে রাখা বালির উপর উঠে শিশু মিলন খেলতে শুরু করেন। এ ঘটনায় প্রধান শিক্ষক ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে শিশুটিকে মোড়ের রফিজ উদ্দিনের চায়ের দোকানের সামনে নিয়ে যান। পরে দোকানের চুলা জলন্ত পলিথিন যুক্ত লাকড়ী দিয়ে তার হাত ঝলসে দেন।

শিশুটির কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলে স্থানীয়রা এসে লবন ও পানি ক্ষত স্থানে লাগিয়ে শিশুটিকে বাড়ীতে পাঠিয়ে দেন। তিনি আরও জানান, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু মিলনকে নিয়ে তাকে অনেক লাঞ্চনা পোহাতে হয়। সবাই মিলনের সাথে দুষ্টুমি করে। তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে।

ঘটনার সময় পাশের ওই দোকানে বসে চা পান করছিলেন জুলহাস উদ্দিন ও আব্দুল করিম। তারা জানান, শিক্ষক এই শিশুটিকে নিয়ে দোকানের সামনে চুলার কাছে আসেন। তারা কিছু বুঝে উঠার আগেই জলন্ত চুলা থেকে আগুনযুক্ত লাকড়ী ও লাকড়ীতে লেগে থাকা পলিথিন দিয়ে শিশুটির ডান হাতে ছ্যাঁকা দিয়ে দেন শিক্ষক মাইন উদ্দিন। একজন শিক্ষকের এমন অমানবিক কাজে আমরা তাৎক্ষনিক প্রতিবাদ করলে শিক্ষক ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত চলে যান।

শিশুটির দাদা লাল মিয়া বলেন, তার নাতি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি। বুঝে না বুঝে হয়তো সে মাস্টারের বাড়ীর কাজ দেখতে গিয়েছিল। তার জন্য কি এভাবে হাতে আগুনের ছ্যাঁকা দিয়ে দিবে।

তিনি আরো বলেন, এ ঘটনার পর অভিযুক্ত শিক্ষক ও তার পিতা এসে এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়ে গেছেন। তবে নাতীর ক্ষত হাতের দিকে তাকালে আর ক্ষমা করতে ইচ্ছে হয় না। এমন ঘটনা যাতে আর কারও সাথে না করতে পারে তাই তিনি, এ ঘটনার তিনি বিচার চান।

অভিযুক্ত শিক্ষক মাইন উদ্দিন মাষ্টারের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তার বাড়িতে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কামরুল হাসান বলেন, তিনি বিষয়টি জানতেন না। তবে এ খবর শোনা মাত্রই সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুন্নাহারকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তিনি ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করে জানাবেন।

শ্রীপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুন্নাহার জানান, ওই শিশুর বাড়িতে গিয়ে তার মা, বাবা, প্রতিবেশী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ঘটনার সত্যতা মিলেছে। প্রধান শিক্ষক মাইন উদ্দিনকে তার বক্তব্য লিখিত আকারে জানতে চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের দায়িত্বই হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের আদর ভালোবাসার মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া। তবে একজন শিক্ষক যদি শিশুকে হাতে আগুণের ছেঁকা দিয়ে থাকেন তা হলে তা নিন্দনীয় ঘটনা। এঘটনার সাথে যদি তার কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোন্দকার ইমাম হোসেন বলেন, তিনি এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিবেন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.