ধারাবাহিক

দু’দিন যাবৎ  পূর্বাকাশে সূর্য দেখা যায় নি। জৈষ্ঠ্যমাসের শেষ আর আষাঢ় মাসের শুরু।  এই সময়টাতে আবহাওয়ার রেওয়াজ ঘন বাদলে। মাথার উপর সীমাহীন আকাশটি বিকট শব্দে  গর্জে ওঠে।বিদুৎ চমকায়।

পশ্চিমা বায়ুর  প্রবল বেগ স্থির বৃক্ষরাজির উপর আঘাত হানে। আকাশে উড়ে চলা মেঘরাজের ঘনকালো ছত্রটি মৃত্তিকার দেহাংশে ঝরে পড়ে,  ঝরে পড়ে মহাজনবাড়ীর স্টিলের টিনে — গোটা গ্রামের সবচাইতে মজবুত পুরোনো টিন। 

বৃষ্টি আসায় সত্যজিত ঘরের জানালাটি খুললো। দু’দিন যাবৎ সে ঘরের দরজা-জানালা  বন্ধ করে প্রায় কয়েদি জীবন যাপন করছে। দু’দিনে একবারের জন্য হলেও সে ঘরের দরজাটি খুলেনি।

দরজা খুলে বেরিয়ে  আসার  জন্য তার মা রীতাদেবী বাইরে দাঁড়িয়ে অনেক পীড়াপীড়ি করেছেন, সমবয়সীদের অনেকেই করেছে আকুল সুরে মিনতি ; কিন্তু সত্যজিত দরজা খুলেনি, খুলতে চায়ও নি।

একটি নিস্তব্ধ ঘরে নীরব প্রাণবন্দি হয়েই রইল। এ যেন  স্বেচ্ছায় দুঃখের কারাবাস। তবে আজ এই বর্ষার সন্ধ্যায় আকাশটা যখন কালো হয়ে আসে,  পাখিরা যখন ফিরে আসে নিজ নিজ নীড়ে, চাঁদটা যবে উড়ে চলে মেঘেদের সাথে  ; উড়তে উড়তে কখনোবা ঢেকে পড়ে কালো মেঘের ছায়ায় — তখনি আচমকা এক ফসলা বৃষ্টির আগমনে সত্যজিতের মনটা কেমন জানি ভার হয়ে আসে। 

বারংবার কেঁদে ওঠে তার মন।  বেদনায় আর্ত মনকে সে প্রশ্ন করে,  দুঃখের ছায়াতলে হৃদয়ের কারাবাস আর কত? মন প্রশ্নের জবাব দেয় না ; তবে চোখ দু’ফোটা অশ্রু দিয়েছে — এই তার সান্ত্বনা। 

এদিকে সত্যজিতের মা রীতাদেবী ছেলেকে নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।  দু’দিন যাবৎ তিনি প্রায় নিরাহার। বাড়ীর সকলের অধীর অনুনয় বিনয় সত্বেও তিনি জলটা পর্যন্ত স্পর্শ করেননি। কেবলই পিছনের ঘরটায় বসে নীরবে অশ্রুপাত করেছেন। বড্ড ভালবাসেন তিনি সত্যজিতকে। সত্যজিত তাঁর একমাত্র সন্তান।

রীতাদেবীর প্রথম মেয়ে সন্তানটি যখন জন্মের আট দিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করে,তার ঠিক বার বৎসর, আট মাস, আট দিন পরই সত্যজিতের জন্ম। প্রথম  মেয়ে সন্তানটির মৃত্যুর নয় বৎসর পরেও যখন রীতাদেবী পুনরায় গর্ভধারণে ব্যর্থ হন, তখন চিকিৎসকেরা তাদের চিকিৎসা বিদ্যায় অকৃতকার্য হয়ে কেবল নিরাশবাক্যই ছুড়েছিল।

প্রায় সব চিকিৎসকেরাই বলেছিল, দুঃখিত আপনার পুনরায় মা হবার আর বিশেষ কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু রীতাদেবী চিকিৎসকের মুখের কথায় বিশ্বাসী ছিলেন না।  উনার বিশ্বাস হৃদয়ের ভেতরকার সত্য ও সুন্দরতায় ছিল, যে সত্য ও সুন্দরতা আশার প্রদীপ হয়ে অদম্য উৎসাহে অপেক্ষা করতে শেখায়। সে অপেক্ষাটা হোক না দীর্ঘ বার বৎসর বা তার চেয়েও বেশী! 

বাড়ির চারপাশের নর্দমা তখন আষাঢ়ের স্ফটিকপ্রভ জলে ভরপুর। ব্যাঙের দল সুর তুলে গান গাইছে । বর্ষার জলে নতুন প্রাণ পেয়েছে ওরা। চলছে উৎসব – প্রণয় সম্ভাষণ, ‘ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ‘। আষাঢ়ের এ তমসাবৃত  রাত্রে মানবকূলের কোন সাড়াশব্দ শোনা গেল না।

চারপাশটা যেন খুব বিশ্রী রকমের অন্ধকার। আকাশজুড়ে কেবল কালো মেঘের ক্ষুদ্ধ গর্জন আর পৃথিবীজুড়ে ব্যাঙের দলের “ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ”।  এই ছিল মেঘমেদুর সে রাত্রির পৃথিবীর আয়োজন। রীতাদেবী নির্ঘুম চোখে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভোরের প্রহর গুনছেন।  কিন্তু না, রাতটা যেনও আর দীর্ঘ, আরও কালো, আরও গহীন।

শেষ হতেই চায় না।  শেষ হবার ইচ্ছেও যেন নেই তার। অন্ততকাল বয়ে যেতে চায় সেই অন্ধকার নিগূঢ় অসহ্য রাত্রি। বারান্দায় নড়ি ভর দিয়ে কেউ একজন পায়চারি করছে। নিঝুম সে বর্ষার রাত্রে এই নড়ির শব্দটাই কেবল মনুষ্য সৃষ্ট বোধ হল।

লোকটা যতীন্দ্র বাবু। রীতাদেবীর বাবা। বয়স পঁচাশি। ভোর হতে তখনও বেশ কয়েক প্রহর বাকি। দরজায় টুকা দিয়ে যতীন্দ্র বাবু  বাইরে থেকে বললেন,  রীতা মা জেগে আছিস ?  

মৃদু আওয়াজ কানে পৌঁছা মাত্রই রীতাদেবী নির্জীবতা কাটিয়ে জবাব করলেন, বাবা বলছ। 

হে মা । রীতাদেবী শশব্যস্ত হয়ে দরজাটা খুলে দিলেন।

 নড়ি ভর দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে যতীন্দ্র বাবু জীর্ণ গলায় বললেন, ঘুম আসছে নারে মা। তাই বারান্দায় পায়চারি করছি।

রীতাদেবী স্নেহমাখা দৃষ্টিতে যতীন্দ্র বাবুর দিকে থাকলেন। দেখলেন দুশ্চিন্তায় উনার মুখ শুকিয়ে আছে। রাতে যে খাওয়া দাওয়া কিছুই হওয়নি সে বিষয়টিও তিনি আঁচ করে নিলেন।

হাত বাড়িয়ে একটা চেয়ার টেনে যতীন্দ্র বাবুকে বসতে দিয়ে রীতাদেবী ক্ষীণ গলায় বললেন, টোলে রাখা ভাত-তরকারি নিশ্চয়ই খাওনি?

যতীন্দ্র বাবু গম্ভীর মুখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,  না।

দুপুরে কোথাও কিছু খাওয়া হয়েছে ?  সারাটা দুপুর তো কোন খুঁজ-খবর পাওয়া গেল না। ওপারার প্রণয় কে বলেছিলাম তোমাকে কোথাও দেখেছে কিনা, সেও কিছু বলতে পারেনি। বড্ড দুশ্চিতায় ফেলেছিলে। 

যতীন্দ্র বাবু মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখ থেকে খুলতে খুলতে বললেন, আমাকে নিয়ে কেন মিচে দুশ্চিন্তা। আমাকে থাকতে দেনা আমার মত।

 রীতাদেবী একটু রাগের ভান করে বললেন, তাই বলে খাবার-দাবারের কোন টাইম-টেবল থাকবে না! সেই সকাল বেলা এক কাপ চা আর দুমুঠো শুকনো মুড়ি খেয়ে কোথায় যে  বেরিয়েছিলে।

তারপর সারাটা দিনে গেল তোমার কোন খুঁজ-খবর নেই। পরে সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরলে, চেহারার একি হাল,  চোখ-মুখ যেন শুকিয়ে খাট হয়ে পড়েছিল। সারাটা জীবনি ত শরীরের উপর অত্যাচার করে কাটিয়েছ। এবার নাই হয় নিজের একটুখানি খেয়াল রাখতে শিখো।

যতীন্দ্র বাবু এবার মৃদু হাসলেন। এতক্ষণ উনার মুখজুড়ে কেবল গাম্ভীর্যতা আর চোখে ছিল বিষন্নতার চাহনি। মৃদু হেসে বললেন,  আমার আর খিদে। দুপুরে সুধিরের দোকানে এক কাপ চা আর পাঁচ টাকার বিস্কুট খেয়েছি। সেই তো আমার রাজখাবার।  এতেই বেশ গিয়েছে দিনটা।

তারপর একটু কেঁশে বললেন, আর কি তালা ভরে ভাত খাওয়ার বয়স রইল রে, মা। নাতিপুতির হাতে মরে যেতে পারলেই বাঁচি। এবার যমরাজ কৃপা করুন। 

 যমরাজ হচ্ছে মৃত্যুর দেবতা। ইদানীং  যতীন্দ্রবাবু প্রায়ই যমরাজের কাছে অধীর আগ্রহ নিয়ে নিজের ভাগের কাঙ্খিত মৃত্যু প্রার্থনা করেন। উনার ধারণা এই বয়সটা হচ্ছে মৃত্যুর উপযুক্ত বয়স।

আচ্ছা মৃত্যুর আবার উপযুক্ত  বয়স হয় নাকি? -মৃত্যু তো যেকোন সময় যেকোনো মুহূর্তে হতে পারে! তাও লোক সমাজের খোশখেয়ালে মৃত্যুর একটা ধরাবাঁধা বয়স আছে।যতীন্দ্র বাবুর  মতে, এই বয়সটাতে এসে যে মানুষটা সাধারণত মরে না,

 তার ইহজগতে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই ভোগ করার থাকে না। এই বয়সটায় এসে প্রতিটা  মানুষ তার কায়িক ও মানসিক উভয় শক্তিই হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। বিবশ শিশুর মত নির্বল মনে হয় নিজেকে। এই বয়সটাতে এসেও যে মৃত্যুকে ভয় পায়, সে জগৎ সংসারের সবথেকে ভীরু, কাপুরুষ।

কেবল বীরপুরুষেরাই যমরাজের কাছে মৃত্যু প্রার্থনা করার মত স্পর্দা রাখে। জগৎ সংসারের মানুষ যেখানে সুখ-সমৃদ্ধি-ঐশ্বর্য প্রার্থনায় ব্যস্ত, সেখানে মৃত্যু প্রার্থনা করাটা নিশ্চয়ই পৌরুষত্বের ব্যাপার!

অথচ যৌবনে তাঁহার প্রার্থনার ঝুলিতেও আর পাঁচ-সাতটা মানুষের মত ছিল নানান চাওয়া – পাওয়া। কিন্তু আজ সবথেকে বিশেষ চাওয়াটা মৃত্যু। মৃত্যুতেই মুক্তি,  মৃত্যুতেই জীবনের শেষ। বয়সটা যেন মৃত্যুর বয়স। 

রীতাদেবী জানালায় মুখ করে বাইরের ঘরটার দিকে থাকিয়ে আছেন।  সত্যজিত এখনও দরজাটা খুলেনি। ঘরের ভেতরেই ঘোপটি মেরে নীরবে বসে আছে। শুধু মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামলেই ঘরের জানালাটা খুলে। গলা ছেড়ে গান করে।

কেউ কিছু বলতে গেলেই ধপাস করে জানালাটা লাগিয়ে আবারও ঘোপটি মেরে বসে থাকে। শেষবার সন্ধ্যায় ঘরের জানালাটা খুলেছিল। আর খুলেনি,—হয়তো আকাশ ফেটে  আর বৃষ্টি নামেনি বলেই! 

যতীন্দ্র বাবু অনুরাগের স্বরে ডাকলেন ,  রীতা।

বাবা।

এভাবে না খেয়ে থাকতে নেই মা। আমাদের  পঞ্চআত্মার খুব কষ্ট হয়। পাপ হয় এতে।

 রীতাদেবী জানালার বাইরের ঘর থেকে চোখ সরিয়ে এনে বললেন, তবে তুমি খাওনি কেন?

যতীন্দ্র বাবু চোখে-মুখে একটা কৃত্রিম প্রফুল্লতার ভাব এনে বললেন,

কে বলেছে খাইনি। শুধু রাতে খাইনে আজ। আর খিদে-টিদেও কিছু পায় না রে। এসিটিক হয়েছে। পেট ভর্তি গ‍্যাস।

আর দুপুরে?

আরে বললাম তো,সুধিরের দোকানে চা-বিস্কুেট গিলেছি। এতেই দিব্বি গেল দিনটা। 

তুই কিছু খা মা। এভাবে আর কষ্ট দিসনে নিজেকে। 

রীতাদেবী মৃদু স্বরে বললেন,  কষ্ট! বাবা আজ দুদিন হল, সত্যজিত কিছু খায়নি। ওর কি কষ্ট হয় না? 

যতীন্দ্র বাবু ভারী গলায় বললেন, অনেক হয়েছে।  সকাল হোক, দেখবি দরজা ভেঙে ওকে বের করে এনেছি। তারপর পেট ভরিয়ে ভাত খাইয়ে তর পাশে এনে বসিয়ে রেখেছি। বড্ড বার বেড়েছে ছেলেটা।  যা ইচ্ছে, তা করবে! কোন কাণ্ড-জ্ঞান নেই! একটি বার নিজের মায়ের কথাটুকুও ভেবে দেখবে না! 

রীতাদেবীর বা-চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। খুবি উন্মনা দেখাচ্ছে তাঁকে।

রীতা মা।

হুম।

যতীন্দ্র বাবু কিছু একটা বলতে গিয়ে

আর বললেন না। শুধুমাত্র মেয়ের অশ্রোতব্য চোখের দিকে নিরুদ্যম নিষ্পলকে থাকিয়ে রইলেন। 

চারদিকে জুড়ে ঘন কালো অন্ধকার। আবহাওয়া বৈরী  থাকার দরুন ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। ইলেক্টিসিটি মাত্র চলে গেছে। এখন জানালার বাইরে থাকালেও বাইরের ঘরটা আর দেখা যায় না।

রীতাদেবীর ভারি দুশ্চিন্তা হতে লাগল। মনের ভেতর নানান এলোমেলো কথা উঠে আসছে। ছেলেটার কি হয়েছে, কোন উল্টাপাল্টা কাজ করে বসবে না তো!…..

কিরণ দেবের ছেলে বকুল মাসখানেক আগে খালি ঘরে দরজা-জানালা লাগিয়ে বিষ খেয়ে মরেছে, তবে কি আজ সত্যজিতও নিজের সাথে খারাপ কিছু করতে যাচ্ছে ! 

ছিঃ,ছিঃ, এসব তিনি কি ভাবছেন। এইতো ঘন্টাখানেক  আগেও তিনি বাইরের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সত্যজিতের সাথে কথা বলে এসেছেন।

এক ভাটি মুগডাল আর শর্ষে দিয়ে কৈ মাছের ঝুল-ভাটি হাতে দাঁড়িয়ে থেকে বারংবার অনুনয় করে বলেছেন, সত্য! এই সত্য! দুমুঠো ভাত খেয়ে নে বাবা। সত্যজিৎ দরজা খুলেনি সত্যি, তবে ঘরের ভেতর থেকে খুব স্বাভাবিক গলাতেই উত্তর করেছে , 

 আমার খেতে মোটেও ইচ্ছে করছে না,মা। খিদে লাগলে নিশ্চয়ই বলব। আমাকে একা থাকতে দাও।  

 আমি ঠিক আছি, মা। মা, প্লিজ! 

সত্যজিতের গলাটা স্বাভাবিক শুনালেও,  আসলে ভেতর থেকে সে গলাটা কোনভাবেই  স্বাভাবিক ছিল না। বুকের ভেতরকার কোন এক চাঁপা কষ্টকে বুঝতে না দেওয়ার একটা কৃত্রিম প্রায়স ছিল মাত্র।

রীতাদেবী নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাভাবিক সে গলার সুরে কোথাও স্বাভাবিকতার লেশ মাত্র নেই। পুরোটাই গোপন রহস্যে ভরপুর। 

আকাশটা কালো মেঘের ভার আর সহ্য করতে পারে নি। নিঝুম রাত্রির উপর এবার মেঘের দল  ধসেই পড়ল। রাতের নিঝুমতা গেল ভেঙে। টিনের চালে শুরু হল বৃষ্টির ঝমাঝম শব্দ। বৃষ্টির একঘেয়ে জাঁকালো  ঝমাঝম শব্দটা রীতিমতো রীতাদেবীর বেশ ভালোই লাগে।

ভালোলাগার অবশ্য অন্য আরেকটা বিশেষ কারণ আছে। কারণটা হল সত্যজিতের বাবা। বৃষ্টি আসলেই লোকটা কেমন জানি অস্থির হয়ে পড়ত।

অনিরুদ্ধ কৌতূহলে দৌড়ে এসে রীতাদেবীকে জড়িয়ে ধরে বলত, রীতা!  রীতা! শুন! শুনো! কি চমৎকার সেতার! ঝমাঝম!  ঝমাঝম!  শুন! শুন! তারপর দিন-কি-রাত, নিঝুম বৃষ্টিতে ঘুরে বেড়িয়েত বাড়ির চারপাশ।

ঘুরতে ঘুরতে হেরল শেখের বাগান থেকে একটা রক্তগোলাপ নিয়ে এসে বলত, ফুলটা কোপায় দাও ত , আমি দেখি,  দেখি আমি!  বলে, লোকটা মুগ্ধ নয়নের অমেয় তৃষ্ণা নিয়ে রীতাদেবীর কোপায় দেওয়া রক্তগোলাপটার দিকে নিষ্পলক থাকিয়ে থাকত, আর বলত, তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি! হে ঐশ্বরী!  কোথায়!  কোথায় যেন দেখেছি!

প্রচন্ড শ্রদ্ধানুভূতিতে  রীতাদেবীর দু-চোখ তখন লোনাজলে ভেসে উঠত। লোকটা এত ভালবাসতে জানে?  এতো?

সত্যজিত আজও যখন নিজের বাবার বিষয়ে জানতে চায়, নিজের বাবার রেখে যাওয়া কোন স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে, তখন রীতাদেবী খুব যত্নে রাখা একটা বিশাল ডায়েরির পাতাজুড়ে লেপ্টে থাকা কালশিটে গোলাপের ঝড়া পাপড়ির কথা বলেন। কিন্তু কখনোই সে ডায়েরি কাউকে পড়তে বা স্পর্শ করতে দেন না।

ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়ায় রীতাদেবী একটা মোমবাতি জ্বালিয়েছেন। জানালা খোলা থাকায় বৃষ্টির সাথে আসা ঝাপটা বাতাস সোজা এসে মোমবাতির উপর আছড়ে পড়ছে। বাতিটার নিবুনিবু অবস্থা। রীতাদেবী তৎক্ষনাৎ জানালাটি বন্ধ করে দিলে  মোমবাতিটা স্হির হয়ে জ্বলতে থাকে।

যতীন্দ্র বাবু হঠাৎ করে কাশতে শুরু করেন। আজকাল খুব অল্পতেই বুকে ঠান্ডা লেগে যায়, কাশ হয়, আর হাঁপানি সমস্যা তো আছেই। রীতাদেবী শশব্যস্ত হয়ে ওঠে  আনলা থেকে সাধা চাদরটা এনে বাপের গায়ের উপর মুড়িয়ে দিলেন। যতীন্দ্র বাবু  থেমে থেমে কাশতেই লাগলেন। রীতাদেবী ব্যস্ত হয়ে বললেন,  বাবা, একটু গরম জল দেব।

যতীন্দ্র বাবু লম্বা শ্বাস টানতে টানতে বললেন, দে তো। রীতাদেবী তাড়াহুড়ো করে টেবিলের উপরে রাখা প্লাক্সবক্স থেকে এক গ্লাস গরম জল ঢেলে দিলেন।  যতীন্দ্র বাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জলটুকু পান করেন।

তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন, বুঝলি মা, জীর্ণ শরীরে আর বাঁচার আনন্দ পাই নে। ঠাকুর যে কেন এ অধমের দিকে মুখ ফিরে থাকান না। হায় ঠাকুর।  বলে চাদর দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন। রীতাদেবী ম্লান মুখে জিজ্ঞেস করলেন,  রাতের ঔষধ নিশ্চয়ই খাওনি? 

যতীন্দ্র বাবু কোন উত্তর করলেন না। নিঃশব্দে নিশ্চল মোমবাতির জ্বলতে থাকা দেখে গেলেন । এই নিশ্চুপতাই ছিল তাঁর উত্তর। আসলে  তিনি ঔষধ খাননি। আর শেষবার কবে তিনি হাঁপানির ঔষধ খেয়েছিলেন তা তাঁর নিজেরি মনে নেই।

এই এলোপাতাড়ি জীবনটাই তার সব থেকে বড় পছন্দের। মৃত্যুর কোন পড়োয়া নেই। যা হবার হবে। আর ভাগ্যক্রমে মরে যেতে পারলে তো সে হবে আরও বড় বেঁচে যাওয়া।

রীতাদেবী আচমকা ব্যস্ত হয়ে উঠে বললেন, বাবা, কিছু লক্ষ করেছ।

যতীন্দ্র বাবু ধীর গলায় বললেন,  কী ।

বৃষ্টি নামলেই আমার সত্যজিত গলা ছেড়ে গান করে। ওই যে ওর গলার সুর শুনতে পাচ্ছ।

যতীন্দ্র বাবু কান পেতে রাত্রির নির্জনতায় ডুব দিলেন। বৃষ্টির ঝামঝম শব্দের সাথে একটি ক্ষীণ গলার সুর ভেসে আসছে। ক্ষীণ সেই গলার সুরটা যে সবসময় স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে তা কিন্তু না। বৃষ্টির ঝামঝম শব্দে সুরটি ক্ষাণিক শোনা যাচ্ছে, ক্ষাণিক না।

তবে গলাটা সত্যজিতের সে বিষয়ে তিনি শতভাগ নিশ্চিন্ত। আর ক্ষীণ সে গলার সুরে যে গানটা ভেসে আসছে, সেটাও বেশ পরিচিত। সত্যজিতকে গুনগুনিয়ে এই গানটি  গাইতে তিনি কতশত বার দেখেছেন, সে হিসেব রাখাটাও মুশকিল। 

সত্যি বলতে কি, বৃষ্টি নামলেই সত্যজিত কেমন জানি গান পাগলু হয়ে যায়। বৃষ্টির ঝামঝম শব্দের সাথে গলা ছেড়ে সুর মিশিয়ে গান করে।  তবে কোন গানেরই পুরোটা গায় না সে। হয় গানের প্রথম কয়েক লাইন, নয়তো শেষের,  নয়তো-বা পছন্দ মতো গানের মাঝের কয়েকটা লাইন গাইতে থাকে।

মোটকথা মনের  অস্ফূট ভাবের সাথে, যে গানের, যে লাইনগুলো সুমজ্ঞস মনে হয় , সেগুলোই গলা ছেড়ে গাইতে থাকে। আজ মনের ভাবস্রোত রবীন্দ্র সংগীতে গিয়ে মিশেছে।  মেঘমেদুর এই বর্ষার রাত্রে রবীন্দ্র সংগীতই তো ভাল মানায়! —

যদি আর-কারে ভালোবাস, যদি আর ফিরে নাহি আস, তবে, তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো॥

যতীন্দ্র বাবু বেশ ভারী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, রাশেদের কোন খুঁজ-খবর পেলি, মা ?

 রীতাদেবী আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, না।

যতীন্দ্র বাবু মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখে দিতে দিতে বললেন,  আচ্ছা ওর বাড়িতে গিয়ে খুঁজ করলে কেমন হয়। 

– আমি ওর মায়ের সাথে কথা বলে এসেছি। তিনি বললেন আজ দু’দিন হল রাশেদ বাড়িতে নেই।  কোথায় গেছে তাও ঠিক করে বলা দায়। শুধু যাওয়ার সময় ওর ছোট বোন তমাকে বলে গিয়েছে, সে নাকি রাতের ট্রেনে শিবগঞ্জ যাচ্ছে।  কেন যাচ্ছ, কি কাজ, তার কিছুই বলে যায় নি।সেলফোনটাও নাকি  বাড়িতে ফেলে গেছে।

 যতীন্দ্র বাবু একটা বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

তাঁর কেন জানি মনে হল 

ব্যাপারটা আসলেই বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তত হাতের কাছে রাশেদকে পাওয়া গেলে এর একটা সুরাহার পথ খুঁজে পাওয়া যেত। সত্যজিতকে যতীন্দ্রবাবু বেশ ভাল করেই চেনেন।

নিজের ভেতর যত বৈক্লব্য-ই  কাজ করুক না কেন, সত্যজিত পরিবারের করো কাছেই মুখ খুলবে না। অন্তরালে সব সহ্য করে যাবে। ফলে এই মুহুর্তে রাশেদ কে হাতের কাছে পাওয়ার থেকে বিকল্প আর কিছু হতে পারে না।

পরিবারের কাউকে কিছু বলুক বা নাই বলুক ,অন্তত রাশেদকে তার মনের দ্বিধা-দ্বন্ধের কথা  সত্যজিত ঠিকি বলবে। আর বলবে নাই-বা কেন। ওরা যে মুদ্রার এপিট-ওপিট! দুয়ে মিলে এক!

কাকে ছাড়া ওদের  কেই – বা থাকতে পারে, কার প্রচ্ছন্ন ঘটনাসমূহই বা ওদের অন্যজন না জানে! ওরা যে সেই শৈশব থেকেই দুয়ে এক, একে অন্যর ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ।

যতীন্দ্র বাবু এবার নড়িতে ভর দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বারবার হাই উঠছে।  এখন বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাকাটাই শ্রেয়।

বাইরের ঘর থেকে যে অস্ফুট গলার সুর বেসে আসছে, তা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করতে করতেই নড়ি ভর দিয় বিছানার উদ্দেশ্য ধীর পায়ে হেঁটে গেলেন। যাওয়ার সময় কেবল বিষণ্ণ গলায় মেয়ে রীতাকে বলে গেলেন,  দুশ্চিন্তা করিস নে, মা। 

অথচ দুশ্চিন্তায় তিনি  নিজেও ভোগছেন। তাও কোন স্বাভাবিক দুশ্চিন্তা নয়, প্রচণ্ড অস্বাভাবিক দুশ্চিন্তা। 

ভোর হতে আর মাত্র দু’প্রহর বাকি। বৃষ্টি  তখনও থামেনি। রীতাদেবী অধৈর্য হয়ে জানালাটা খুলে দিলেন। গলাটা তখন বেশ স্পষ্ট ভেসে আসছে —

যদি      আর-কারে ভালোবাস,    যদি    আর ফিরে নাহি আস,

তবে,    তুমি যাহা চাও, তাই যেন পাও,    আমি যত দুখ পাই গো॥

ঝাপটা হাওয়ায় মোমবাতিটা নিভে যায়। পৃথিবীজুড়ে  তখন নেমে আসে  গাঢ় গহীন নিস্তব্ধ অন্ধকার। বোধ হল স্বর্গ- মত্য- অন্তরীক্ষ বলে কিছু নেই। জগৎ ব্যাপিয়া যা কিছু আছে তা কেবলি গাঢ় গহীন নিস্তব্ধ অন্ধকার। 

সেই নিস্তব্ধ অন্ধকারের বুক ফোটো করে বাতাসে ভেসে বেড়ায় একটা দীপ্ত মিহি সুর। যে সুর নির্ঘুম চোখের ক্ষিপ্রতা  কাটিয়ে নিদ্রাসুখে শায়িত করে চিত্ত।

ভোর সূর্যের স্নিগ্ধ রশ্মি ঘা ছুঁয়ে দিলে ঘুম ভাঙ্গে রীতাদেবীর। পাখির কলরবে বিমোহিত চারপাশ। নিঁখুত সুমধুর আশ্চর্য সুর নিয়ে পক্কীকূল মাতিয়ে তুলেছে প্রকৃতি। রাত্রির ঘুমন্ত পৃথিবীটাকে নিজ নিজ সুরে জাগিয়ে তুলাই যেন ওই পাখিদের কাজ!

জানালার ওপাশে দিগন্তের রক্তিম সূর্য কোমল রশ্মি ছিটিয়ে কাছে ডাকছে পৃথিবীটাকে। আকাশে তখন একফোঁটাও মেঘ নেই।  পরিষ্কার স্বচ্ছ রঙিন নীলাকাশ।

রীতাদেবী শশব্যস্ত হয়ে ডায়েরির উপর থেকে মাথা গুছলেন। জানালার  এপাশের টেবিলে মাথা হেলিয়ে  ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। ঘুম ভাঙ্গতেই চোখ পড়ে বাইরের ঘরটার দিকে।

কি আশ্চর্য, ঘরের দরজা-জানলা সবি খোলা! তার থেকে বড় আশ্চর্য খোলা ঘরের কোথাও সত্যজিত নেই। বাইরের ঘরটার দিকে দৌড়ে ছুটে যান রীতা দেবী। না, সত্যজিত সত্যিই নেই! বিছানার বালিশে খোলা ডায়েরির পাতায় সযত্নে লেখা একটা চিরকুট — 

দুঃখ নিও না মা,

আমি নিশ্চয়ই ফিরবো। 

উদ্বেগ উত্কণ্ঠায় রীতাদেবীর প্রায় পাগল হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এইতো সেদিন, ষোল বৎসর আগের কথা,  ঠিক এমনি এক মেঘমেদুর বর্ষার পররাত্রে ওর বাবা প্রসেনজিৎ কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছিলেন!  আর ফিরলেন না। তবে কি আজ তাঁর প্রাণপ্রিয় সত্যজিতও! ( ক্রমশ) 

লেখক : জয় পাল,  শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ৩য় বর্ষ, ২য় সেমিস্টার, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,সিলেট। 

ইমেইল: Mrjoypaul111@gmai. com  

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.