আহ্বান

গুমরে মরেছি শুধু মনের গভীরে
অস্ফুট আর্তিতে আর অপেক্ষায় অপেক্ষায়
বয়ে গেছে রক্তধারা এই যমুনায়।

রুধিরের স্রোত-জল বৃথা, সব বৃথা
অনেক মায়াবী রাত ঝলমলে দিন,
নিতান্ত নিষ্ফল তারা, অপুষ্পক স্মৃতি।
এখনও গোলাপবাগে আধফোটা কুঁড়ি,

ভ্রমরের স্পর্শ পেতে প্রচণ্ড উন্মুখ
প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষা নিয়ে রাত ভোর জেগে
সরিয়ে রেখেছি পাশে বরমাল্য খানি।

তারার জন্মের পর তারার মৃত্যুতে,
চুপচাপ কাল স্রোতে বয়ে গেছে কাল
নিঝুম দুপুর থেকে ধূসর বিকেলে 
অলিন্দে একাকী বসে দেখেছি জগত
লুকিয়ে রেখেছি কত চোরাবালি স্রোত
লুকিয়ে রেখেছি কত পক্ষবিধূনন।

আগ্নেয়গিরির সেই উদ্গিরণের মত
আজ আমি অভিসারী, রোমাঞ্চ পিয়াসী।
তুমি এসো, 
মুগ্ধতার সে প্রাচীন  আধিকার নিয়ে এসো, 
রুদ্ধদ্বারে বার বার কর করাঘাত
তোমার উদ্ধত ফনায় আমাকে বিদ্ধ কর,
মুগ্ধ কর, কর শিহরিত, বাজিয়ে তোমার বীন
নিয়ে চল জ্যোৎস্নার মায়াবী জগতে।

তোমার ডানার স্বেদ বিন্দু 
গড়িয়ে পড়ুক আমার ডানায়
কানায় কানায় উপচে উঠুক রসস্রোত
পিয়াসী তৃষ্ণার্ত বুকে ঢেলে দাও অমৃত তোমার…

বাক্যহারা-১

রাতদুপুরে আসছে উড়ে একটা দুটো স্বপ্ন পাখি
হারানো সেই সোনালি দিন, এখন একে কোথায় রাখি!
আবছা আলোয় চমকে দেখি সেই যে তুমি মেঘের মেয়ে
কলসি নিয়ে দুপুরবেলা একটু দুলে ফিরছ নেয়ে
হালকা রঙা কলকা শাড়ি, দুলছে বেণী ইচ্ছেমতো
স্তব্ধ চোখে থমকে থাকি, আরে এটাই সেই ছবি তো!
সেই যে যেটা হারিয়ে গেছে একটুখানি অসাবধানে
আজ পুরোটা রাখব ধরে, আজকে লিখে রাখব প্রাণে।
গভীর রাতে আবছা আলো, হতেও পারে চোখের ভুল
বলো না তুমি সত্যি করে,তুমি কি সেই টগরফুল?
যাচ্ছে খুলে স্মৃতির পাতা,ডাগর চোখে দেখছি খালি
অরফিউস ও ইউরিডিসি, বুদ্ধদেব ও আম্রপালি…
স্বর্গ বুঝি আসল নেমে আবছা আলো ঘরের কোণে
না বলা কথা অনেক ছিল পড়ছে না যে কিছুই মনে।
হঠাৎ দেখি কাঁদছ তুমি, তোমার চোখে অশ্রুধারা
তোমার মুখে আমার ছায়া আনন্দেতে বাক্যহারা।

বাক্যহারা-২

বুঝতে পারনি বুঝতে চাওনি বলে,
সুরের ইশারা ক’জনে বা বলো বোঝে?
কত কত মেঘ রোজ চলে যায় ভেসে
অবুঝ মনটা তবুও তোমায় খোঁজে।

নদী ছুটে চলে, মেঘেরাও ভেসে যায়-
পাহাড়ের থেকে ঝর্ণারা এসে নামে,
তবু একা একা বিষন্ন সন্ধ্যায়
না বলা কথারা থেকে যায় নীলখামে।

গুমরে গুমরে এ কেমন বেঁচে থাকা?
চারদিক জুড়ে নীরবতা, গিরিখাত
সময় চলেনা, থমকে থেমেছে চাকা,
ঘিরে ঘিরে ধরে অমাবস্যার রাত।

ভাঙা ডানা নিয়ে তবুও তো পথ চলি,
শীতের বিকেলে ক্লান্ত রোদের মত
বিষাদ রাঙানো নদী আর কানাগলি,
দিগন্ত জুড়ে মন খারাপের ক্ষত!

বাক্যহারা-৩

অবলা কথারা আটকে রয়েছে চোখে
অবুঝ মনের বোবা কান্নার মতো
আজকে এখন পাথর চোখেতে শুধু
হারানো আবেগ পুরানো দিনের ক্ষত।

বুঝলে না কিছু বুঝতে চাওনি বলে
সুরের ইশারা সুরকার শুধু জানে
দূরের বাতাস দূরে চলে যায় আরও
মন শুধু বোঝে হারানো গানের মানে।

এসেছিল যেটা একদিন নিঃশব্দে
বাতাসেও ছিল চুপিচুপি আসা যাওয়া
রূপকথা দেশে হারানো বিকেলগুলো
সবটাই যেন মিথ্যে অলীক মায়া।

জীবনের খাতা ভাসানোর পর পর
দুচোখ ভেজায় অঝোর অশ্রুধারা
অল্প দুঃখে সশব্দে কেঁদে ওঠে
গভীর দুঃখে ঠোঁটেরা বাক্যহারা।

আশ্রয়

সেই ছোট্টবেলা থেকে আমার 
ঘরে থাকার অভ্যাস 
বাইরে আমি শুইনি কখনও 
গায়ে লাগেনি শীতের কনকনে বাতাস
কিংবা বৃষ্টির ছাঁট।

কালবৈশাখী এলেও তার আঁচ 
বুঝতে পারিনি কোনোদিন 
সেই ছোট্টবেলা থেকে আমি আছি
নিশ্চিন্ত ছাতার তলায়।

বাবা হাড় জিরজিরে হয়ে গেছেন
চোখে পুরু চশমা, বুকে পেসমেকার
তবু ছাতাটি আছে হাতে তার
শক্ত,খুব শক্ত করে ধরা
সতর্ক দৃষ্টি তার চারদিকে 
যেন কিছুতেই না ভেজে তার সন্তান।

আশার বাষ্প

মহামারী এসে জীবন কাড়ছে তবু
আমরা চেয়েছি গেয়ে যেতে সেই গান
শবের উপরে জমছে শবের স্তুপ,
কবরের পাশে বেঁচে ওঠে কিছু প্রাণ।
রাত্রির বুকে বাড়ছে আঁধার রোজই
ফুল তবু ফোটে শবদেহটার পাশে
চাঁদ নেই তবু দূরের আকাশে দেখ,
কিছু ছোট তারা আলো দেয়,ভালোবাসে।

মৃত্যু আসছে কাড়ছে মায়ের কোল
কত ভাবনারা আর তো পেল না ভাষা
বেশ কিছু ফুল অকালেই ঝরে গেল,
মৃত্যুর পরও থেকে যায় প্রত্যাশা। 

দূরের তারার ক্ষীণকায় স্মিত আলো
সংকেতে বলে সংগ্রাম আছে বাকি
তারা খসে গেলে মৃত্যুর গান গেয়ে,
তখনও দেখবে ডাকছে ভোরের পাখি।

সৃষ্টি

নক্ষত্রের আগুনে ডানা সেঁকে নিচ্ছে প্রাচীন পেঁচারা
সুপারনোভার পরে আবার বাজনা বেজে উঠল
সত্য আর মিথ্যা একাকার হয়ে যায় যে বিন্দুতে
তারও ওপারে অনেকটা ফুটে উঠেছে সূর্য
ফ্যাকাসে রাত্রিরা পুড়ছে নক্ষত্রের আগুনে
পাখির মত ছোট পৃথিবী উড়ে যাচ্ছে আকাশে
লম্বা চাঁদটা গোল টিপের মত হয়ে এল
শিশু ঈশ্বর কাদামাটি দিয়ে গাছপালা আর মানুষ গড়ছেন
বিন্দু বিন্দু আশার বাষ্প জমে উঠছে দিগন্তে
পৃথিবী আর মানুষের ভাগ্যের মত কৃপণ নয়
তোমার মুখে একটি সবুজ গ্রামের ছবি

বুমেরাং 

আমাজনের সেইসব মৃত গাছেরা বল্লম হয়ে ছুটে আসছে
মৃত পশুদের কঙ্কাল থেকে বার হচ্ছে কাঁটা বিষ
দু’ধারে সারি সারি বন্ধ দোকান
যত্রতত্র মৃত্যুর শীতল ছোবল
সব নৌকারা থেমে আছে
মনখারাপের পাতার ওড়াউড়ি
চুনের চেয়েও সাদা বিষন্নতা
রাত্রে পুলিশ জ্বালিয়ে দিচ্ছে শব
পরিজনেরা আসেনি সমাধিতে
জীবন এত কঠিন হবে ভাবিনি
অদৃশ্য পেঁচারা উড়ছে
গোটা মানবজাতি ভয়ে কুঁকড়ে ঢুকেছে জেলখানায়
বিষন্ন নীলাভ মানুষ হাত-পা ছুঁড়ছে
বাতাসে অক্সিজেন নেই।

বীজ

যেভাবে তারার পাশে গ্রহে-গ্রহে জেগে ওঠে প্রাণ
জ্যোৎস্নার পরশ পেলে পাহাড়ও তো গেয়ে ওঠে গান।

আলো-জল-মাটি পেলে সেভাবেই বীজ জেগে ওঠে
হাজার বছর পরে দীঘি জুড়ে নীলপদ্ম ফোটে।
কত আশা, কত স্বপ্ন, কত ধৈর্যে সব চেপে রেখে
সময় সুযোগ পেলে ফুলে-ফলে ছবি দেয় এঁকে।

চতুর্দিকে অমানিশা, প্রাণঘাতী কত চক্রব্যূহ
লুকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে চারাগাছ, গোটা মহীরুহ।

আধোআধো ঘুমে মোড়া রহস্য লুকিয়ে আছে কী যে
গোটা এক মহাকাব্য লেখা থাকে অতিক্ষুদ্র বীজে!

সুদীপ্ত বিশ্বাস, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, রানাঘাট, নদিয়া।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.