বাংলাদেশের মানুষ ইদানিং ভ্রমণে বেশ সময় দিচ্ছে। করোনা মহামারীর শুরুর আগে গেলো কয়েক বছর দেশের ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে পর্যটকদের পদচারনায় ভরে থাকতো। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর আবার শুরু হয়েছে তাদের ঘুরাঘুরি। আজ বলছি আমাদের সম্প্রতি ঘুরে আসা কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম মিঠামইন সফরের কথা।

দিনটি ছিলো এ মাসের (সেপ্টেম্বর ২০২০) ১২ তারিখ, শনিবার। ঢাকা থেকে আমরা ছয়জন দু’টি গাড়ি নিয়ে মিঠামইনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই সকাল ৬ টায়। সঙ্গী আমার সাবেক সহকর্মী কামরুল ভাই, এনামুল, সঞ্জিব দা, পলাশ ভাই ও অরুন। আমাদের রোডম্যাপ ঢাকা সিলেট রাস্তা ধরে ভৈরব হয়ে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর। ঢাকা থেকে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দূরে বাজিতপুরের দিলাল্পুর বাজারে পৌঁছে যাই আমরা সকাল ১০ টা নাগাদ । আরেক সাবেক সহকর্মী ইঞ্জিনিয়ার রাকিবের গ্রামের বাড়ি সেখানে। সে যেতে না পারলেও আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলো। আমরা প্রাইভেট কার দু’টি একটি মাদ্রাসার ভেতরে মাঠে রেখে ড্রাইভারদেরও আমাদের সাথে নিয়ে যাই। রাকিবের এক স্থানীয় বন্ধু আমাদের জন্য ইঞ্জিন চালিত বোট ঠিক করে রেখেছিলো। স্থানীয় বাজার থেকে দুপুরের লাঞ্চের জন্য আমরা নিয়েছিলাম একটি রাজহাঁস ও হাওরের তরতাজা চিংড়ি। যেহেতু আমরা নৌকাতেই দুপুরের খাবার খাবো তাই একজন বাবুর্চি নিয়েছিলাম সাথে।

সকাল সাড়ে দশটায় আমরা রওয়ানা হই মিঠামইনের উদ্দেশ্যে। চারদিকে নীল জলরাশি, আমরা চলছি হাওরের বুক চিড়ে। নৌকার ছাদে বসে প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখতে দেখতে আমরা যাচ্ছি। কিছুদূর যাওয়ার পর বৃষ্টির কবলে পড়ে গেলাম আমরা। বোটের ছাদ থেকে নেমে আমরা এবার ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ওদিকে আমাদের রান্নার প্রস্তুতি চলছে। রাজহাঁস রান্না হবে সাথে সাদা ভাত ও চিংড়ি। চলতে চলতে আমরা দেখতে পেলাম সেই মিঠামইনের রাস্তা ও ব্রিজ। দেখতে পেলাম ট্যুরিস্টদের বাইক চালানো। প্রায় দু’ঘন্টা পর দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে আমরা পৌঁছলাম মিঠামইনের নতুন সারমারসেবল রাস্তায়। যেটি নির্মাণে বিশেষ ভুমিকা ছিলো বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদের। বর্ষায় এতোদিন ডুবে থাকতো পুরো চার উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, নিকলি ও অষ্টগ্রাম। তখন হাওরে একটা কথা প্রচলিত ছিলো ‘বর্ষায় নাও আর শুকনায় পাও’। এরপর আমরা বোট থেকে নেমে সেই নতুন রাস্তায় উঠলাম। কি অপরুপ সুন্দর চারপাশটা। যেনো অজানা অচেনা এক বাংলাদেশ। সাই সাই করে ছুটে যাচ্ছে একের পর এক ট্যুরিস্ট মোটরসাইকেল।

আমরা দু’টি অটো রিকশা ভাড়া করলাম কামালপুর যাওয়ার জন্য। উল্লেখ্য, কামাল্পুর আমাদের রাষ্ট্রপতির গ্রামের বাড়ি। আমরা চলছি হাওরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা নতুন রাস্তা দিয়ে। নির্মল বাতাস আর কিচির মিচির পাখির শব্দে অচেনা এক সুর বেজে যাচ্ছে চারদিকে। নানা ধরনের পাখি দেখলাম। তারমধ্যে ছিলো বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা। কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পর একটি তিন রাস্তার মোড় চোখে পড়লো। যেখান থেকে ইটনা চলে গেছে ডানে আর বায়ে কামালপুর। দুপুর ১ টা নাগাদ প্রেসিডেন্টের বাড়ির একেবারে কাছে গিয়ে নামলাম আমরা। বাড়ির সামনে পুলিশ প্রহড়া ছিলো। কিছু সময় ঘুরে পাশে থাকা মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করলাম।

এরপর আবার ফিরতি যাত্রা করলাম সেই ব্রিজের দিকে যেখানে আমাদের নৌকা রাখা ছিলো। তখন প্রায় দুপুর আড়াইটা। আমরা সবাই আবার নৌকায় উঠে গেলাম। চলতে চলতে এবার আমরা দুপুরের খাবার খাচ্ছি। নৌকার ছাদে বসে সবাই একসংগে উপভোগ করলাম রাজহাঁসের মাংস, চিংড়ি দিয়ে গরম ভাত। আস্তে আস্তে চলছে আমাদের নৌকা। আমরা দেখছি বকের সারি। সূর্য তখন অস্তাচলের পথে। দিলালপুর ফিরতে ফিরতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। সেখানে নেমে স্থানীয় মিষ্টির দোকানে আমরা খেলাম কেবল বানানো গরম রসমালাই, সন্দেশ ও দই। এরপর আবার যান্ত্রিক নগরী ঢাকার দিকে ছুটে চললো আমাদের গাড়ি দু’টি। আর পড়ে রইলো কিছু ভালোলাগা সুন্দর কিছু মুহূর্ত।

অলিউর রহমান খান
কবি, লেখক, আবৃত্তিকার।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.