মানুষের কথা বলার অধিকার এবং নির্ভয়ে মতামত প্রকাশের অধিকারের চেয়ে বড় আর কোন অধিকার নেই। যেকোন সুস্থ গণতান্ত্রিক দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তার চর্চা করা, যৌক্তিক বিতর্কের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করা, সংবিধানের আলোকে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।

অন্যান্য মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সুযোগ দেয়া এবং ন্যায়-বিচার প্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সহ উপরোক্ত সকল অধিকার গুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব হচ্ছে সেই দেশের সরকারের। যেকোন সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু জনগণ ভোট প্রদানের মাধ্যমে সরকার কে ক্ষমতায় আনে, তাই প্রকৃতপক্ষে জনগন-ই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উৎস।

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী আমরা জানি, “Democracy is government of the people, by the people, and for the people” -অর্থাৎ, গণতন্ত্র হচ্ছে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত, জনগণের দ্বারা পরিচালিত এবং জনগণের জন্য গঠিত সরকার ব্যবস্থা।

যেকোন সরকার যেহেতু জনগণের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে, তাই সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে জনগণের কল্যাণে কাজ করা, জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা দেয়া এবং জনগণের জন্য ন্যায়- বিচার নিশ্চিত করা। এগুলো হচ্ছে যেকোন সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একেবারে মৌলিক কিছু দায়িত্ব।

যেকোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য, তথা, একটি গণতান্ত্রিক দেশ পরিচালনার মূল ভিত্তি হচ্ছে সেই দেশের সংবিধান। যেকোন সুস্থ গণতান্ত্রিক দেশ তার দেশের সংবিধানকে দেশ পরিচালনা করার অকাট্য মূল দলিল হিসেবে বিবেচনা করে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র সেই সংবিধান অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে বাধ্য থাকে।

একটি ভালো সংবিধান সেই দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করে। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা এবং নির্ভয়ে মত প্রকাশ করা, এমনকি ভিন্ন মত পোষণ করা দেশের প্রতিটি নাগরিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার। যেকোন সভ্য সমাজ এবং উন্নত রাষ্ট্র জনগণের এসকল অধিকারের ব্যাপারে সর্বদা সচেতন, যত্নশীল এবং শ্রদ্ধাশীল আচরণ করে থাকে।

একটি ভালো গণতান্ত্রিক দেশ তার নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে – এর ব্যত্যয় ঘটলে বুঝতে হবে সেই দেশে গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থা অর্থহীন। নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদান, সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং ন্যায়-বিচার প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে সেই রাষ্ট্র একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হবে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, লেখক- বুদ্ধিজীবী, ছাত্র সমাজ, শিক্ষক- গবেষক থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের তার্কিক জ্ঞানের বিকাশের লক্ষ্যে সুস্থ এবং যৌক্তিক বিতর্কের পরিবেশ তৈরি করে দেয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এটি না থাকলে একটি দেশে নতুন নতুন আইডিয়া এবং নতুন সৃজনশীল চিন্তার উন্মেষ ঘটবেনা – দেশ কখনো সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না।

আমরা জানি সংবিধানের মূল স্তম্ভ হচ্ছে চারটি – (০১) সংসদ, (০২) বিচার বিভাগ, (০৩) নির্বাহী বিভাগ এবং (০৪) মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যম। যেকোন গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় নাগরিকের তথ্য ও সংবাদ প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যম সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

তাই যেকোন সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় সংবাদ মাধমের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের বাধাহীন সুযোগ নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। যেকোন রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। মানুষের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার এবং ন্যূনতম মানবাধিকার হারানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই জনগণের দায়িত্ব হচ্ছে ভোট প্রদান করে সরকার গঠনের পরেও সার্বক্ষণিক ভাবে সরকারে কাজ- কর্মে সজাগ দৃষ্টি রাখা।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, খুবই বিশ্বস্ত, যোগ্য এবং প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও সাহসী সাংবাদিকদের একটি প্রতিষ্ঠান “Reporters Without Border” প্রতিবছর সারা বিশ্বের সকল দেশের গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থার সার্বিক দিক এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি নিয়ে “World Press Freedom Index” নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে।

উক্ত রিপোর্টে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ২০১৯ সালে বিশ্বের ১৮০ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫০ তম এবং ২০২০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১ তম। নিঃসন্দেহে ১৮০ টি দেশের মাঝে ১৫০ ও ১৫১ তম স্থান দখল করা কোন গর্বের বিষয় নয়।

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ এসব গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান এবং খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে, আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন এবং বিভিন্ন গবেষণার ক্ষেত্রে  আমাদেরকে জবাবদিহিতা মূলক এবং লজ্জাজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। এটির একটি স্থায়ী সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক সূচকের পাশাপাশি “The Economist” এর বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সূচক ভিত্তিক প্রতিবেদন “The Democracy Index” এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান “Freedom House” কর্তৃক প্রকাশিত “Freedom in The World 2021: Democracy Under Siege” নামে নতুন যে বার্ষিক প্রতিবেদন আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে, সেখানেও দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার কোন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

সারা বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বুঝাই যাচ্ছে – এই পৃথিবীতে গণতন্ত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এটি মানবতার কল্যাণের জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিৎ এবং সর্ব সাধারণকে এর কুফল সম্পর্কে সচেতন করে তুলা উচিৎ।

এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, নিয়মিত হুমকি পাচ্ছেন, মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন, জেল- জুলুম সহ্য করছেন, এবং এমনকি নির্মমভাবে হত্যার শিকার পর্যন্ত হচ্ছেন।

অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় এসব অপরাধের শিকার হয়েও অনেকে ন্যায়-বিচার পর্যন্ত পাচ্ছেন না। সংবিধানের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে সংবাদমাধ্যম এবং মিডিয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ প্রত্যাশিত নয়। সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সময় সকল সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সারা বিশ্বের সার্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বল অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে নিরপেক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ সকল প্রতিষ্ঠানকে এক যোগে কাজ করতে হবে এবং মানুষের ন্যুন্যতম গণতান্ত্রিক অধিকার এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের মত মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে জাতিসংঘ’কে এসকল বিষয়ে নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

যেকোন মূল্যে আমরা আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই, যৌক্তিক বিতর্কের মাধ্যমে মুক্ত আলোচনার সুষ্ঠু পরিবেশ চাই এবং মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও ন্যায়-বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা চাই।

মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কিংবদন্তি আফ্রো- আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী নেতা Martin Luther King Jr. এর একটি বিশ্ব বিখ্যাত উক্তি দিয়ে আমার আজকের লেখা শেষ করতে চাই। তাঁর উক্তিটি ছিল – “Injustice anywhere is a threat to justice everywhere”.

লেখক: মোস্তাফিজুর রাহমান
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব, ইতালি। কমিউনিটি প্রোগ্রামার- আর্লি স্টার ডট কম এবং ডিপার্টমেন্ট অব ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাটা সায়েন্স এন্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইউনিভার্সিটি অব রোম- এ অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *