দেশে ও প্রবাসে নারী II


রাজধানী ঢাকার বনানীতে জবার বাসা। বিরাট পাঁচতলা বাড়ি। একেক ফ্ল‍্যাটে চারটা ইউনিট। সব ফ্ল‍্যাট ভাড়া দিয়ে দু’তলার ফ্ল‍্যাটে জবা থাকেন হাজবেন্ডকে নিয়ে।নিচের ফ্ল‍্যাটে দারওয়ান থাকে। সে বাসা দেখা-শোনা করে, আর দারওয়ানের বউ জবার বাসার রান্না বান্না, গৃহস্হালী সব কাজ করে দেয়।

জবার ছেলে মেয়ে দুইজন সপরিবারে আমেরিকায় বসবাস করছে। বছরে একবার এসে মা বাবাকে দেখে যায়। জবাও হাজবেন্ডকে নিয়ে মাঝে মধ্যে আমেরিকা ঘুরতে যান।স্হায়ীভাবে সেখানে থাকার কোন ইচ্ছে তার নেই। দেশই তার কাছে প্রিয়। আলিশান গাড়ি চড়ে মাঝে মধ্যে গ্রামের বাড়ি যান। গাঁয়ের মানুষের সুখ দুখের কথা শুনেন।তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।


মখমলের বিছানা, এসি ফিট রুম। বাহারী খাবার-দাবারে প্রতিদিন টেবিল সজ্জিত। তবু জবার চোখে ঘুম নেই।জবার চোখে ভাসে অতীতের কষ্টার্জিত দিনগুলি। মাষ্টার বাবার একা আয়ে দশটা ভাই বোনের অভাবের সংসার।মায়ের হাতের আলু-বেগুনের পাতলা ঝুলের তরকারী।কত স্বাদ ছিলো তাতে। সব ঈদে নতুন জামা কিনে দেয়ার সামর্থ্য ছিলো না বাবার। ছোট বেলায় অত শত কি বুঝতাম? প্রতিবেশীর ছেলেমেয়ের নতুন জামা দেখে কান্না করতাম। আমিও এমন জামা চাই। মা বলতেন,বড় হলে এইরকম কত জামা পড়বি মা।


অসুখ না হলেও এখন রেগুলার ডাক্তারে চেকআপে যেতে হয়। যেতে দেরি করলে বাচ্চারা ফোন করে বিরক্ত করে। কেন চেকআপ করাই নাই। অথচ ছোটবেলায় কত বড় বড় অসুখ হতো, মা সূরা ফাতেহা পড়ে ফু দিতেন, ভালো হয়ে যেতাম। ফুট প্যাচরা হলে কাঁচা হলুদ-সরিষার তৈল একসাথে গরম করে মা মালিশ করে দিতেন, ভালো হয়ে যেতাম।

মায়ের হাতের স্পর্শে যেন অসুখ কেমনে উড়ে যেতো। গলায় মাছের কাঁটা বিঁধলে, গলায় হাত বুলিয়ে মা ফু দিতেন। কিছুক্ষণ পর কাঁটা চলে যেতো। চোখে বালি পড়লে মা কেমনে দোয়া পড়ে সেই বালি নিজের হাতে এনে আমাদের দেখাতেন, এই দেখ বালি। আমরা অবাক হয়ে যেতাম।


আজ এত প্রাচুর্য, এত সুখ তারপরেও জবার চোখে ঘুম নেই। জবার ইচ্ছে করে মায়ের স্পর্শ পেতে। বাবার পাশে বসে ধারাপাতটা আবার মুখস্হ করতে। ভাই বোন সবার সাথে বসে খাবার ভাগ করে খেতে। ইচ্ছে করে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলতে, মাগো নতুন জামা চেয়ে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, মাফ করে দিও। আমি বুঝিনাই বাবার যে আয় ছিলো সীমিত। ইচ্ছে করে নরম তুলতুলে কম্বল ছুড়ে ফেলে দিয়ে, মায়ের হাতের সেলাই করা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকতে।

জবার এই ইচ্ছেগুলো এখন আর পূরণ হবেনা। মা বাবা কবে পরপারে চলে গেছেন! ভাই বোন একেক জন্য একেক জায়গায়। যার যার ছেলেমেয়ে সংসার নিয়ে সবাই ব্যস্ত। বয়সের ভারে কেউ ন্যুব্জ। জবা প্রায়ই ফোন করে কথা বলে সবার সাথে। তারপরেও জবার চোখে ঘুম নেই………….!

শাহারা খান (কবি, লেখিকা)
যুক্তরাজ্য প্রবাসী

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *