বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি অন্যতম মুসলিমপ্রধান দেশ, এবং একমাত্র মুসলিম প্রধান দেশ যেখানে ইসলাম ধর্মের বড় বড় সকল ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষ্যে বেআইনি ভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হঠাৎ করেই যুক্তিহীন ভাবে বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে নব্বই শতাংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী, স্বাভাবিক ভাবে তারাই এই অন্যায়ের শিকার হন সব চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে এমনিতেই মানুষ নানা রকম কঠিন জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করে থাকেন। খাদ্যে ভেজাল, বিভিন্ন অনিয়ম, প্রায় সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি, নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যু, দূষিত প্রাকৃতিক পরিবেশ, ন্যায়-বিচার হীনতা এবং দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা সহ আরও অনেক ধরনের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে দিয়ে মানুষ কোন রকমে কষ্ট করে জীবনযাপন করে থাকেন।

অথচ, কথায় কথায় নব্বই ভাগ মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে গর্ব বোধ করা একটি দেশে যদি ইসলাম ধর্মের সব থেকে বড় উৎসবে অন্যায় ভাবে মানুষকে জিম্মি করে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করে দেশের সাধারন মানুষকে অযৌক্তিক দামে জিনিসপত্র ক্রয় করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেটি মোটেই গর্বের কোন বিষয় নয়।

গত দশ বছর ধরে আমি নিজে বাংলাদেশের বড় বড় সব পত্রিকায় রমজান মাস ও ঈদের আগে অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক ও বেআইনি ভাবে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি নিয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ সব আর্টিকেল এবং সংবাদ প্রতিবেদন দেখেছি এবং গুরুত্ব সহকারে পড়েছি। বাংলাদেশের বড় বড় অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও গবেষক এরকম বেআইনি ও লাগামহীন ভাবে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির বিরুদ্ধে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল লিখেছেন।

সেসব গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রবন্ধে তাঁরা ইসলাম ধর্মের আলোকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কালোবাজারী করা ও অবৈধ মজুদের মাধ্যমে কৃত্তিম সংকট তৈরি করে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য অন্যায়ভাবে বৃদ্ধি করা যে একটি ইসলাম বিরোধী কাজ, সেটি তাঁদের লেখায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। অথচ, গত দশ বছরের আমার পর্যবেক্ষণের মধ্যে বাংলাদেশে কোন ঈদ অথবা, রমজান মাসের মত বড় বড় ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষ্যে আমি জিনিসপত্রের দাম কখনো কমতে দেখিনি, কেউ দেখেছেন বলে মনে হয় না।

প্রতিবছর শুধু দাম বাড়ে এবং বরাবরের মতো এবারও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দাম ইতিমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ, আমরা জানি বিশ্বের যে কোন সভ্য দেশে ধর্মীয় বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষ্যে জিনিসপত্রের মূল্য হ্রাস করতে দেখা যায়। ইউরোপ – আমেরিকায় প্রতিবছর তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব বড়দিন উপলক্ষ্যে কখনো বেআইনি ভাবে হঠাৎ করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে না, উল্টো জিনিসপত্রের দাম হ্রাস করতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের স্বার্থান্বেষী ধর্মীয় রাজনৈতিক দল সহ অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলকে আজ পর্যন্ত ধর্মীয় উৎসবের আগে এভাবে অনৈতিকভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যুতে ছোট-বড় কোন ধরনের আন্দোলন করতে দেখা যায় নি। প্রতিবছর বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারন মানুষ এত বড় একটি অমানবিক অপরাধের শিকার হচ্ছেন, অথচ, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, আজ পর্যন্ত নব্বই ভাগ মুসলমানের এই দেশে এটি গুরুত্বপূর্ণ কোন ইস্যু হয়ে উঠেনি।

দেশের বেশিরভাগ দরিদ্র, অল্প শিক্ষিত এবং অসচেতন মানুষকে ধর্মের নামে ব্রেইন ওয়াশ করে নিজেরা ফায়দা লুটার জন্য গুরুত্বহীন বিভিন্ন ইস্যুতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বেশ কিছুদিন ধরে আন্দোলনের নামে সহিংসতা করে আসছে। মান সম্মত শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ, নিরাপদ জীবন ব্যাবস্থা, বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ, ন্যায় -বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বাদ দিয়ে ভাস্কর্য -মূর্তির মত অপ্রয়োজনীয় ইস্যু নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করার মাধ্যমে দেশের মানুষের সময়, মেধা ও দেশের সম্পদ নষ্ট করা ছাড়া এসব ইস্যুবিহীন আন্দোলনে দেশের মানুষের বিশেষ কোন লাভ হয়নি।

বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার সকল সাধারন মানুষ একত্রে সংগঠিত হয়ে দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে যৌক্তিক উপায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কর্তৃক অন্যায়ভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই অপসংস্কৃতি বন্ধের জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করা উচিৎ। দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে যেকোন যৌক্তিক দাবী সরকারের কাছে উত্থাপিত করলে সরকার সেটি পজিটিভ ভাবে বিবেচনা করতে বাধ্য থাকবে।

অনেক সময়, বিভিন্ন কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দেশের মানুষের সমর্থন সরকারকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলে। দেশের মানুষের সমর্থন পেলে বিভিন্ন কুচক্রী মহল এবং বড় বড় দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সরকারের জন্য সহজ হবে।

দেশের সাধারন মানুষের বৃহৎ স্বার্থে আমাদের সকলের উচিৎ সকল মত পার্থক্য ভুলে গিয়ে বিভিন্ন শক্তিশালী অসাধু মহলের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়ার জন্য জন সমর্থন সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে সহযোগীতা করা। সরকারের উচিৎ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যুতে দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের বেশিরভাগ মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য কমপক্ষে বড় বড় ধর্মীয় উৎসবের সময় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা এবং দ্রুত সেটি কার্যকর করা।

রমজান মাসের সংযমের শিক্ষা থেকে আমাদের সবার আরেকটু সংযমী এবং মানবিক হওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ। ব্যবসায়ীদের উচিৎ অতি মুনাফার লোভ সংবরণ করা, সততার সাথে ব্যাবসা করা। ইসলাম ধর্মের শিক্ষা থেকে আমরা জানি, পরকালে সৎ ব্যবসায়ীরা শহীদদের সাথে অবস্থান করবেন। তাই ব্যাবসায়ীদের উচিৎ ইহকালের ক্ষণস্থায়ী জীবনে অতি মুনাফার লোভ বাদ দিয়ে সততার সহিত ব্যবসা পরিচালনা করা।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও রমজানের শিক্ষার প্রতিফলন ঘটুক আমরা সেটিই প্রত্যাশা করি। আসুন আমরা ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি করা থেকে দূরে থাকার জন্য সংযমের অভ্যাসের অনুশীলন করি। আসুন আমরা সবাই পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে পরিবারের সদস্যদের সাথে এবং অন্যান্য মানুষের সাথে সংযমের সহিত আচরণ করি, সুন্দর ব্যাবহার করার চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ্‌ পাক পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষ্যে আমাদের আত্নাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে দিন, আমীন।

লেখকঃ মোস্তাফিজুর রাহমান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব ইতালি, কমিউনিটি প্রোগ্রামার- আর্লি স্টার নিউজ এবং ডিপার্টমেন্ট অব ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাটা সায়েন্স এন্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ইউনিভার্সিটি অব রোম- এ অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *