প্রতি বছর ঈদের আনন্দ, অনুভূতিগুলো ক্রমাগতই ছোট হয়ে আসছে! তুলনামূলকভাবে গত দুই বছর ধরে ঈদের কোন অস্তিত্ব নাই বললেই চলে! প্রতি বছর পুরনো ঈদের সেই স্মৃতিগুলোতে সাঁতরে বেড়াতে বেড়াতেই যেনো নতুন ঈদের দিনটি অতিবাহিত করা এক অভ‍্যাসে দাঁড়িয়েছে!

আহা! ছোটবেলার ঈদগুলো কতো আনন্দে কাটাতাম! বাবা ঈদের আগে সারাদিন মার্কেটে ঘুরে রাতে সবার জন‍্য নতুন জামা-কাপড় নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। সেই জামা নিয়ে আমাদের কত লুকোচুরি! কেউ দেখে ফেললেই যেনো জামা পুরনো হয়ে যাবে! তাই নতুন জামা-কাপড় না ধুয়েই ঈদের দিন পড়া হতো। বলা বাহুল‍্য, আজ তা অকল্পনীয়!

ঈদের আগেরদিন রাত জেগে পিঠা পায়েস তৈরির ঊৎসব, সে এক অন‍্যরকম অনুভূতি! বাবা ডালপুরি খেতে খুব পছন্দ করতেন, আমারও খুব পছন্দ; ডালপুরি ছাড়া আমাদের একটা ঈদ কল্পনাও করা যেতো না, যা খেলে আজ বদহজম হয়।

তারপর একদিন কোরবানী ঈদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে, ঈদের কয়েকদিন আগে সকল আনন্দ মাটি করে বাবা চলে যান। যথারীতি সে বছর ঈদের দিনও শোকাহত পরিবারে ঈদ আয়োজনের কোন কমতি ছিল না। মেঝো চাচা সকল কিছুর বন্দোবস্ত করেছিলেন, যাতে বাবা হারানো সন্তানগুলো ঈদের দিনে বাবার অভাব বুঝতে না পারে (একজন বড় মনের মানুষ ছিলেন। আল্লাহ্ তাঁকে বেহেস্ত নসীব করুন)।

শাক দিয়ে ভাতের অভাব মেটানো কি আদৌ সম্ভব! পরবর্তী কয়েকটা বছর এর রেষ থেকে যায়। ঈদের আগে বাবা হারানোর কষ্ট আর আগের মতো আনন্দ উপভোগ করতে দেয়নি, যদিও মায়ের কারণে কোনকিছুর অভাব হয়নি কখনো। তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল সন্তানদের জন‍্য।

দ্বিতীয় ধাপে প্রবাস জীবন! এখানে এসে ঈদের আনন্দ আরও ফ‍্যাকাসে। অবশিষ্ট‍্য যা ছিল, তাও নেই। মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনকে ছেড়ে ছুটিবিহীন এক অন‍্যরকম পরিবেশে অন‍্যরকম সংস্কৃতিতে ঈদের পরিধি যেনো আরও ছোট হতে থাকলো! মনে পড়ে একবার চাকরি বাঁচাতে গিয়ে ঈদের দিনেও দুই ঘন্টার জন‍্য কাজে যেতে হয়েছিল।

বড় মেয়েটা যখন ছোট ছিল, একদিন স্কুলে না গেলে তেমন কোন সমস‍্যা হতো না, যত বড় হতে লাগলো স্কুল কামাইও ততই কঠিন হতে লাগলো। ২০১৮ সালে ঈদের দিনে মেয়েকে স্কুলে যেতে হয়েছিল কারণ তাঁর বিশেষ ক্লাস ছিল। ২০১৯ এ ঈদ পড়লো তাঁর পরীক্ষার সময়। রান্না-বান্না যা করলাম, যত আয়োজন, মনে হলো সবই যেনো বৃথা! ঈদের আনন্দ এভাবে ক্রমশ ছোট হতে থাকলো!

গত বছরের পরিস্থিতি সবারই জানা। লকডাউন চলাকালীন সময়ে পড়লো আমাদের ঈদ!

এবারের ঈদটা একেবারেই ছোট, বলা যায় শূণ‍্য! মেয়ের সাথে দুই সপ্তাহ ধরে ক্লিনিকে আছি ছোট বাচ্চাটাকে রেখে। দেখা করতে আসলেও গ্লাসের ভেতর থেকেই বিদায় দিতে হয়। বর্তমান নিয়ম হচ্ছে, হাসপাতাল বা ক্লিনিকে একবার ঢোকলে আর বের হওয়ার অনুমতি নেই, যতক্ষন না মুক্তি মিলে। এমনকি বাসা থেকে খাবার আনা, পরিবারের কারও কাছাকাছি যাওয়া নিষেধ। তাই ছোট বাচ্চাটাকেও স্পর্শ করার অধিকার নেই। সেদিন খুব খুশি হয়ে এসেছিল আমাদের দেখতে, কিন্তু কাছে আসতে পারছিল না বলে চোখ টলমল করছিল। এতোটুকু ছোট বাচ্চা নিজেকে স্বযত্নে সামলে নিলো, শুধু তাকিয়ে দেখলাম।

আজ বের হওয়ার কথা ছিল। অনেক আশা নিয়ে রাতে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম অন্তত ঈদের দিনের বিকালটা অন্তত দুই মেয়েকে নিয়ে একসাথে কাটাতে পারবো, ভালো-মন্দ কিছু রেধে খাওয়াতে পারবো। সকালে ডাক্তার এসে নিরাশ করে গেল।

যথারীতি শুরু হলো স্মৃতিতে সাঁতরানো। মন খারাপ দেখে মেয়েটা কাঁদছে। মেয়েকে শান্তনা দিলাম, বেঁচে থাকলে, সুস্থ হলে আজীবন ঈদ করা যাবে মা। ঈদের চেয়েও সুস্থ হওয়া জরুরী। মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা এমনও হতে পারে- পৃথিবীর কোন প্রান্তে কোন মা আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাঁর কোন সন্তানকে চিরতরে হারিয়েছে অথবা হারাতে যাচ্ছে। তাঁর ঈদটা আজ কেমন কাটবে?

পরক্ষণেই মনে হলো, আমি অনেক ভালো আছি। আমার মেয়েটা একটু অসুস্থ, ইন্শাআল্লাহ্ চিকিৎসার বদৌলতে সুস্থ হয়ে যাবে। এরপর যদি আল্লাহ্ সবাইকে বাঁচিয়ে রাখেন, পরবর্তী ঈদ একসাথে করা যাবে। অতীতের স্মৃতিতে পড়ে থেকে বর্তমানের সুখ নষ্ট করার কোন মানে আছে কি? আজ কিছু নাই বলে আফসোস করছি। আজ যা আছে, আগামীকাল তাও হারাতে পারি। তখন আজকের দিনটাকে মনে করেই দ্বিগুণ কষ্ট পাবো।

না, শুধু অতীতের সাথে তুলনা করে প্রতিটা আনন্দ নষ্ট করা বোকামী। যখন, যেখানে, যে অবস্থায় আছি তাতে সন্তুষ্ট থাকার মধ‍্যেই আছে প্রকৃত আনন্দ। কী নেই বা কী হারিয়েছি তা নিয়ে পড়ে না থেকে, আমার জন‍্য আল্লাহর দেয়া কী নেয়ামত আছে তার একটু চর্চা করি তবেই প্রতিটা দিন, প্রতিটা মূহুর্তকে উপভোগ করা সম্ভব। হয়তো এই শিক্ষাটা দিতেই আল্লাহ এই পরিস্থিতি আমার জন‍্য তৈরি করেছেন।

সবার ঈদ আনন্দে কাটুক প্রিয়জনদের সাথে। পরবর্তী ঈদগুলো হোক অধিকতর আনন্দময়। যা অসাধ‍্য তা নিয়ে ভাবনা নয়, যা আছে তাই হোক উপলব্ধ- অতীত নয়, বর্তমান পাক গুরুত্ব!

সৈয়দা হাসিনা দিলরুবা ( ইয়াসমীন)
সম্পাদিকা, আর্লি-স্টার
পালেরমো, ইতালি।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *