কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায় || সিদ্ধার্থ সিংহ
ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের প্রভাবে রাইটার্সের বড় বড় অফিসাররাও অভ্যাস পালটে ফেলতে বাধ্য হলেন। কারণ, তিনি তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এর আগে তাঁরা কেউ ১১টার আগে অফিসেই আসতেন না।

টমাস জানিয়েছেন, লর্ড কার্জন এই রকমই ডিসিপ্লিন চেয়েছিলেন। তখন ১১টায় এসে বড় বড় অফিসাররা ১টায় লাঞ্চ করতে বেরিয়ে যেতেন। ফিরতেন ৩টে নাগাদ এবং সাড়ে চারটে বাজতে না বাজতেই বাড়ির পথে হাঁটা। অগত্যা লর্ড কার্জনের লিখিত নির্দেশ এল, পদস্থ অফিসারেরা কেরানিদের আগে অফিস ছাড়তে পারবেন না।

বিধানচন্দ্র রায় মুখ্যমন্ত্রী হলেও তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল তিনি একজন চিকিৎসক। কে যেতেন না তাঁর কাছে? বিশ্ববিখ্যাত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মতিলাল নেহরু, মহাত্মা গাঁধী, বল্লভ ভাই পটেল, মৌলানা আজাদ, জওহরলাল নেহরু, তাঁর কন্যা ইন্দিরা। এমনকি তাঁর গুণগ্রাহীদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি থেকে শুরু করে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এটলিও।

মতিলাল নেহরু তো দু’জন চিকিৎসক আনসারি আর বিধানচন্দ্রকে তাঁর দেহের দুই ট্রাস্টি বলে পরিচয় দিতেন। আর ‘মহাত্মা গান্ধী-বিধানচন্দ্র রায়’ সম্পর্কটা তো পৌঁছে গিয়েছিল কিংবদন্তি পর্যায়ে। গান্ধী অনশন করলেই সব কাজ ফেলে বিধানচন্দ্র ছুটতেন তাঁর পাশে থাকবার জন্য।

পুণের আগা খাঁ প্যালেসে তখন মহাত্মা গান্ধী বন্দি। সব রকম ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। দেহাবসান অনিবার্য। তিনি মৃত্যুপথযাত্রী জেনে, ইংরেজ জেলার তাঁর সৎকারের জন্য চন্দন কাঠ পর্যন্ত জোগাড় করে রেখেছেন।

গান্ধী যখন কারও কথাই শুনছেন না, তখন বিধানচন্দ্র তাঁকে ওষুধ খাওয়ার জন্য অনুরোধ করতেই গান্ধীজি কঠিন ভাবে বললেন, ‘কেন আমি তোমার কথা শুনব? তুমি কি এ দেশের চল্লিশ কোটি মানুষকে আমার মতো বিনামূল্যে চিকিৎসা করো?’

বিধানচন্দ্র বললেন, ‘না গান্ধীজি, সবাইকে বিনামূল্যে চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি তো মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে চিকিৎসা করার জন্য এখানে আসিনি‌। আমি এসেছি এমন একজনকে চিকিৎসা করতে, যিনি আমার কাছে আমার দেশের চল্লিশ কোটি মানুষের প্রতিনিধি।’

সেই কথার পরিপ্রেক্ষিতে গাঁধীজি যেটা বলেছিলেন, সেটা স্মরণীয় হয়ে আছে। উনি বলেছিলেন, ‘তুমি তো মফসসল আদালতের থার্ড ক্লাস উকিলের মতন তর্ক করছ। ঠিক আছে, ওষুধ নিয়ে এসো, আমি খাব।’

আর একবার বিধানচন্দ্র বলেছিলেন, ‘উকিল হয়ে আমি হয়তো আরও অনেক বেশি টাকা রোজগার করতে পারতাম, কিন্তু তা হলে আমি তো মহামানব গান্ধীর চিকিৎসা করতে পারতাম না।’

আর একবার স্বয়ং গান্ধীর সামনে বিধানচন্দ্রের চেহারার সৌন্দর্যের প্রশস্তি করে সরোজিনী নাইডু বলেছিলেন, ‘বিধান, তুমি হাসলে এখনও তোমার গালে টোল পড়ে, ব্যাপারটা কী?’

কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায়

বিধানচন্দ্র বলেছিলেন, সেই টোলে কেন যে বয়োজ্যেষ্ঠর নজর পড়ে যায়! তার পর এই সরোজিনী নাইডুকে উনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন— আপনি কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর মধ্যেও মিকিমাউসকে খুঁজে পেয়েছিলেন।

নেহরু-বিধান পত্রাবলি খুঁটিয়ে দেখলে অনেক ঘটনা পাওয়া যায়, যা হৃদয় স্পর্শ করে। সিরিয়াস বিষয়ের মধ্যেই নেহরু তাঁর বন্ধু বিধানচন্দ্রকে অনুরোধ করছেন, কলকাতা থেকে গোটা বারো ডাব পাঠিয়ো। ইন্দিরার পেটের রোগ কমছে না।

এক সময় গোটা ভারতের ধারণা ছিল, কলকাতার ডাবই পৃথিবীর সেরা। পরের দিন একজন বিড়লা দেখা করতে এলে বিধানচন্দ্র তাঁকে বললেন, গোটা কয়েক ডাব আজকেই প্রাইভেট বিমানে দিল্লি পাঠিয়ে দাও।

ডাব ছাড়া নেহরুর আরেকটি প্রিয় খাবার ছিল উত্তরপাড়ার ‘তরমুজ রসগোল্লা’। বিধানচন্দ্রের এই বিখ্যাত উপহারের জন্য জওহরলাল অপেক্ষা করে থাকতেন।

পরিবারের প্রিয় চিকিৎসক বিধানের ওপর নেহরুর এতই ভরসা ছিল যে, ইন্দিরার অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি কলকাতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। অথচ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দু’জনের মধ্যে পত্রযুদ্ধ লেগেই থাকত।

নেহরু একবার বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বাংলার সমস্যাটা কী? বিধানচন্দ্র সেই চিঠির উত্তরে যা লিখেছিলেন, সেটা আজও নির্মম এবং ঐতিহাসিক সত্য হয়ে আছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘ভেবেচিন্তে দেখলাম, বাঙালিদের তিনটে সমস্যা: ১. খাওয়াদাওয়ার সমস্যা, ২. রুজিরোজগারের সমস্যা, আর ৩. মাথা গোঁজবার সমস্যা।’

এমন সহজ ভাবে অন্ন, কর্ম আর বাসস্থান সমস্যায় জর্জরিত বাঙালির রোগনির্ণয় আর কেউ কখনও করতে পেরেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তবে আমার স্মৃতিতে আছে সেই মহার্ঘ্য ছবিটি, যাতে ধরা পড়েছে প্রধানমন্ত্রী নেহরু দিল্লি যাওয়ার আগে দমদম বিমানবন্দরে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের বুকে গোলাপ লাগিয়ে দিচ্ছেন।

জওহরলাল নেহরুর চিকিৎসায় ডাক্তার বিধানচন্দ্রের ভূমিকার ছোট্ট একটি বিবরণ দিয়েছেন নীতীশ সেনগুপ্ত।

দিল্লির সব নামকরা ডাক্তার সে বার নেহরুর অসুস্থতার কারণটা ঠিক বুঝতে পারছেন না। বিচলিত হয়ে ইন্দিরা খবর দিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে। মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হল। ইন্দিরা ও লালবাহাদুর সমস্ত রাত জেগে আছেন। কারণ, অস্বস্তিতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারছেন না নেহরু।

ভোরবেলা লালবাহাদুর ফোন করলেন ডাক্তার বিধানচন্দ্রকে এবং তাঁকে দ্রুত দিল্লি আসতে বললেন। বললেন, তাঁর জন্য একটা বিশেষ বিমান দমদমে অপেক্ষা করছে।

কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায়

নেহরুর ঘরে বিধানচন্দ্র ঢুকতেই মেডিক্যাল বোর্ডের যাবতীয় রিপোর্ট তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। তিনি সেটা সরিয়ে দিয়ে বিখ্যাত বাঙালি চিকিৎসক ডা. সেনকে তিরস্কার করলেন, ‘তুমি এ রকম অপদার্থ!’

তার পর নিজে স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। পেটে থাবড়া মেরে শব্দ শুনলেন। এবং উপস্থিত একজনকে কাপড় কাচার সাবান আর গরম জল আনতে বললেন।

ডাক্তার বিধানচন্দ্র নিজের হাতে ওই সাবান গুললেন এবং লালবাহাদুর ছাড়া সবাইকে ওই ঘরের বাইরে চলে যেতে বললেন।

তার পর তিনি নেহরুর পাজামার গিঁট খুলতে যেতেই নেহরু ধমকে উঠলেন। তখন বিধানচন্দ্র উলটে তাঁকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘আমি ডাক্তার, তুমি রোগী। একদম চুপ করে থাকবে।’ তার পর অয়েল ক্লথ বিছিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি দু’বার ডুস দিলেন। এবং বেডপ্যান পেতে দিলেন।

কলকাতায় ফোন করে একটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ, কয়েকটা ডাব আর ডানলোপিলো পাঠাতে বললেন। এর পর নেহরুকে পুরো সুস্থ করার জন্য বিধানচন্দ্র প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নিঃশব্দে কলকাতা-দিল্লি ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেছিলেন এয়ারফোর্সের বিমানে।

মুখ্যমন্ত্রী হবার কিছু পরেই একবার বিধানচন্দ্রের খুব জ্বর হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকার জিজ্ঞেস করলেন, আপনার অসুখ হলে আপনার চিকিৎসা কে করেন?

উনি বলেছিলেন, ‘বিধান রায়। আমি আয়নার দিকে তাকাই। আর অমনি সেই প্রতিচ্ছবি, মানে বি সি রায় আমার চিকিৎসা করে।’

হোমিওপ্যাথি সম্বন্ধে এক ইন্সিওর কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে তিনি কৌতুক করে বলেছিলেন, এক রোগী একটা ছুরি গিলে ফেলেছেন। বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ প্রথম ডোজ দিল, অমনি পেটের ছুরির ফলার ধারটা ভোঁতা হয়ে গেল। দ্বিতীয় ডোজে ছুরির ফলাটা কাঠের হাতলের ভাঁজে ঢুকে গেল। আর তৃতীয় ডোজের পরে ছুরিটি সর সর করে বেরিয়ে এল রোগীর কোনও ক্ষতি না করে!

শুধু হোমিওপ্যাথি নয়, তিনি যে নিজের অ্যালোপ্যাথি পেশার ডাক্তারদের নিয়েও রসিকতা করতে ছাড়তেন না, তার ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে। হায়দরাবাদের এক সভায় তিনি ভাষণ শেষ করেছিলেন এই গল্পটি বলে—

লন্ডনের উপকণ্ঠে একদল গুন্ডা পিস্তল দেখিয়ে একটা বাস থামাল। তাদেরই একজন বাসে উঠে প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে টাকার ব্যাগ কেড়ে নিচ্ছিল। সবার শেষে বাসের শেষ প্রান্তে এক বুড়োর কাছে গিয়ে হাত পাততেই, বুড়ো তাঁর ব্যাগ তার হাতে তুলে দিতে দিতে একটু হেসে বলল, ‘দেখো ছোকরা, তোমার বিনয় দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমি ডাক্তার। আমরা ডাক্তাররা মানুষের টাকা আর জীবন দুই-ই নিয়ে থাকি।’

বিধানচন্দ্র খুব ছোটবেলা থেকেই সর্দিকাশি জাতীয় ছোটখাটো রোগে খুবই ভুগতেন। তাঁর প্রথম হার্ট অ্যাটাক করেছিল ১৯৩০ সালে। তখন তিনি কংগ্রেসের কাজে আমদাবাদ থেকে দিল্লির পথে।

এই অ্যাটাক নিয়ে তেমন হইচই হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাক মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে। এ বারেও তাঁকে অমানুষিক পরিশ্রম থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যেতে হয়নি। শুধু দৈনিক রুটিনের পরিবর্তন করে দুপুরে ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া করে, বাড়িতেই ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম করতেন। তার পর আবার রাইটার্সে যেতেন।

অন্তিমপর্বের শুরু ২৪ জুন ১৯৬২ সালে। রাইটার্সে ওইটাই তাঁর শেষ দিন। নিমপীঠের এক সন্ন্যাসীকে বললেন, ‘শরীর যেমন ঠেকছে কাল নাও আসতে পারি।’ মাথায় তখন প্রচণ্ড যন্ত্রণা।

পরের দিন বাড়িতে ডাক্তার শৈলেন সেন ও যোগেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকা হল। তাঁরা তাঁকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।

কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায়

৩০ জুন বিধানচন্দ্র তাঁর প্রিয় বন্ধু ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন, ‘’আমি তিরিশ বছর ধরে হৃদরোগের চিকিৎসা করে আসছি। আমার কতটা কী হয়েছে আমি তা ভাল করেই বুঝতে পারছি। কোনও ওষুধই আমাকে আর ভাল করতে পারবে না।’

১ জুলাই তাঁর জন্মদিন। সে দিনই তাঁকে দেখতে তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা এলেন। পরিচারক কৃত্তিবাসের হাত থেকে এক গ্লাস মুসুম্বির রস খেলেন। বন্ধু সার্জেন ললিতমোহনকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ললিত আমার গুরুও বটে, ওর কাছ থেকে কত কিছু শিখেছি।

তার পর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বললেন, ‘আমি দীর্ঘ জীবন বেঁচেছি। জীবনের সব কাজ আমি সমাধা করেছি। আমার আর কিছু করার নেই।’ এর পর বললেন, ‘আমার পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।’

সেটা শুনেই তাঁর নাকে নল পরানো হল, ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ১১টা ৫৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

দুঃসংবাদ পেয়ে দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তীদেবী বলেছিলেন, বিধান পুণ্যাত্মা, তাই জন্মদিনেই চলে গেল। ভগবান বুদ্ধও তাঁর জন্মদিনে সমাধি লাভ করেছিলেন।

এই বিধানচন্দ্র রায়কেই পশ্চিমবঙ্গের রূপকার বলে অভিহিত করা হয়। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্নে ভূষিত করা হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানে কলকাতার উপনগরী সল্টলেকের নামকরণ করা হয় বিধাননগর।
তাঁর জন্ম ও মৃত্যুর দিন, মানে ১লা জুলাই দিনটিকে সারা ভারতে ‘চিকিৎসক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

দেহাবসানের কয়েক বছর আগে কেওড়াতলা মহাশ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লির সূচনা করতে এসে বিধানচন্দ্র বলেছিলেন, ‘ওহে, আমাকে কিন্তু এই ইলেকট্রিক চুল্লিতেই পোড়াবে, বুঝেছ?’

অবশেষে ২ জুলাই, ১৯৬২ সালে তাঁর সেই শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়। নির্মাণ করা হয় আকাশচুম্বী এক স্মৃতিসৌধ।

সিদ্ধার্থ সিংহ
কলকাতা, ভারত।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *