সে সময় যে কোনও লোকই ব্যাঙ্ক খুলতে পারত। ব্যাঙ্ক ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন। আদিত্যর এক বন্ধু ব্যাঙ্ক খুলেছিল। নতুন ব্যাঙ্ক। কারা টাকা রাখছে, সে-ই দেখে বাকিরাও টাকা রাখার ভরসা পেত। তাই যারাই ব্যাঙ্ক খুলত, তারা তাদের অঞ্চলের জ্ঞানীগুণী, বিখ্যাত, সমাজের বিশিষ্ট লোকজনদের গিয়ে ধরত, যাতে তাদের ব্যাঙ্কে তাঁরা টাকা রাখেন।

একদিন আদিত্য এসে বলল, দাদা, আমার এক বন্ধু একটা ব্যাঙ্ক খুলেছে। ও জানে, আপনি আমার নিজের দাদার মতোই। তাই আমাকে খুব ধরেছে, আপনি যদি ওর ব্যাঙ্কে কিছু টাকা রাখেন, তা হলে ওর একটু সুবিধে হয়। না-হয় দিন কয়েক পরে টাকাটা আবার তুলে নেবেন। আসলে বুঝতে পারছেন তো, মানে…

— ঠিক আছে, ঠিক আছে। কিছু টাকা ওই ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়ো।
কিছু মানে কত টাকা, সেটা অমরেন্দ্রনাথ বলেননি। আদিত্য তাই রাতারাতি পাহাড় প্রমাণ টাকা সেখানে জমা করে দিল।

সকালের দিকে বৈঠকখানায় বসতেন অমরেন্দ্রনাথ। তাঁর আত্মীয়-স্বজন তো বটেই, দূর-দূরান্ত থেকেও তাঁর কাছে লোক আসত। টাকার অভাবে কে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না, কে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা চালাতে পারছে না, কার বাড়ি ভেঙে পড়ছে, হিংসে করে পুকুরে বিষ ঢেলে দেওয়ায় মাছের চাষে সমস্ত পুঁজি ঢেলে কে সর্বস্বান্ত হয়েছে— সবাই, সবাই তাঁর কাছে আসত এবং উনিও যখন যতটা যা পারতেন, তাদের সাহায্য করতেন।

লোকমুখে এ খবর ছড়িয়ে পড়েছিল বহু দূর দূর। সেখান থেকেও লোকজন আসত এবং এই ধরনের লোকের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছিল। যত বাড়ছিল, ততই বিরক্ত হচ্ছিলেন ম্যানেজার। এই বাড়িতে বাজার-হাট থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচখরচা, সব কিছুরই হিসেব রাখতে হয় তাঁকে। সবাই তাঁকে ম্যানেজারবাবু বলে ডাকে। বহু দিনের পুরনো লোক। সেই কবে থেকে বাবুকে উনি দেখছেন। কিন্তু বাবুর এখনকার মতিগতি মোটেও ভাল লাগে না তাঁর। তাই টাকার অঙ্ক একটা শ্লিপে লিখে যখনই কাউকে তাঁর কাছে অমরেন্দ্রনাথ পাঠান, ওঁর সারা শরীর জ্বলে যায়।

এর থেকেও বেশি জমি, একেবারে রাস্তার উপরে, তার উপরে মাত্র কয়েক বছর আগে তৈরি হয়েছে এ রকম চোখ ধাঁধানো বাড়িই কত কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, সে সব ফেলে এত দাম দিয়ে কি এ বাড়ি কেউ কিনবে? কত লোক আমাকে ধরছে বাড়ি নেওয়ার জন্য। সাধাসাধি করছে। তাই-ই নিচ্ছি না। তবু তুমি যখন বলছ, ঠিক আছে, আমি না নিলেও এই বাড়ির খদ্দের আমি ঠিক জোগাড় করে দেব। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমার কী থাকবে?

যাদের কাজ থেকে বাড়ি কিনছিল, তাদের কাছ থেকে যেমন এই ভাবে কাটামানি খাচ্ছিল, ঠিক তেমনি অমরেন্দ্রনাথকে আবার উলটো বোঝাত, এমন বাড়ি আপনি মাথা কুটলেও পাবেন না। একবার গিয়ে দেখে আসুন। লোকের লাইন পড়ে গেছে। তবু আমি লোক লাগিয়েছি, তাকে একটু টাকা-পয়সা খাওয়াতে হচ্ছে, তা হোক। তবু এমন সুযোগ হাতছাড়া করা আমাদের ঠিক হবে না। আমি দেখছি কী করা যায়। এই ভাবে এক-একটা বাড়ি কিনতে গিয়ে দু’জনের কাছ থেকেই কাড়ি-কাড়ি কাটমানি নিচ্ছিল আদিত্য।

সে সময় যে কোনও লোকই ব্যাঙ্ক খুলতে পারত। ব্যাঙ্ক ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন। আদিত্যর এক বন্ধু ব্যাঙ্ক খুলেছিল। নতুন ব্যাঙ্ক। কারা টাকা রাখছে, সে-ই দেখে বাকিরাও টাকা রাখার ভরসা পেত। তাই যারাই ব্যাঙ্ক খুলত, তারা তাদের অঞ্চলের জ্ঞানীগুণী, বিখ্যাত, সমাজের বিশিষ্ট লোকজনদের গিয়ে ধরত, যাতে তাদের ব্যাঙ্কে তাঁরা টাকা রাখেন।

একদিন আদিত্য এসে বলল, দাদা, আমার এক বন্ধু একটা ব্যাঙ্ক খুলেছে। ও জানে, আপনি আমার নিজের দাদার মতোই। তাই আমাকে খুব ধরেছে, আপনি যদি ওর ব্যাঙ্কে কিছু টাকা রাখেন, তা হলে ওর একটু সুবিধে হয়। না-হয় দিন কয়েক পরে টাকাটা আবার তুলে নেবেন। আসলে বুঝতে পারছেন তো, মানে…
— ঠিক আছে, ঠিক আছে। কিছু টাকা ওই ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়ো।
কিছু মানে কত টাকা, সেটা অমরেন্দ্রনাথ বলেননি। আদিত্য তাই রাতারাতি পাহাড় প্রমাণ টাকা সেখানে জমা করে দিল।

সকালের দিকে বৈঠকখানায় বসতেন অমরেন্দ্রনাথ। তাঁর আত্মীয়-স্বজন তো বটেই, দূর-দূরান্ত থেকেও তাঁর কাছে লোক আসত। টাকার অভাবে কে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না, কে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা চালাতে পারছে না, কার বাড়ি ভেঙে পড়ছে, হিংসে করে পুকুরে বিষ ঢেলে দেওয়ায় মাছের চাষে সমস্ত পুঁজি ঢেলে কে সর্বস্বান্ত হয়েছে— সবাই, সবাই তাঁর কাছে আসত এবং উনিও যখন যতটা যা পারতেন, তাদের সাহায্য করতেন।

লোকমুখে এ খবর ছড়িয়ে পড়েছিল বহু দূর দূর। সেখান থেকেও লোকজন আসত এবং এই ধরনের লোকের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছিল।
যত বাড়ছিল, ততই বিরক্ত হচ্ছিলেন ম্যানেজার। এই বাড়িতে বাজার-হাট থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচখরচা, সব কিছুরই হিসেব রাখতে হয় তাঁকে। সবাই তাঁকে ম্যানেজারবাবু বলে ডাকে। বহু দিনের পুরনো লোক। সেই কবে থেকে বাবুকে উনি দেখছেন। কিন্তু বাবুর এখনকার মতিগতি মোটেও ভাল লাগে না তাঁর। তাই টাকার অঙ্ক একটা শ্লিপে লিখে যখনই কাউকে তাঁর কাছে অমরেন্দ্রনাথ পাঠান, ওঁর সারা শরীর জ্বলে যায়।

আগের জন বলে উঠল, সমুদ্রের জল ফুঁসতে ফুঁসতে পুকুরে পড়তেই মাছগুলো ছটফট করতে করতে জল থেকে তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাগল। মিনিট কয়েক পরেই দেখি মাছগুলো জলের উপরে ভাসছে।
— কেন?
— এত নোনা জল… পাশের জন বলল।
আর একজন তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে, নিজের হাঁটু দেখিয়ে বলল, চাষের জমিতে এই এত্তখানি করে নোনাজল‌। আগামী তিন-চার বছর আর কিচ্ছু চাষ হবেনি বাবু।

প্রথমজন বলল, মহামারী না লাগে… সকালের দিকে বোঝা যায় না। বিকেলের দিকে রোদ পড়লেই চড়াই পাখির মতো এই বড় বড় এক-একটা মশা। কথা বলা যায় না। চোখে-মুখে ঢুকে যায়।
পাশের জন বলল, কারও ঘরে খাবার মতন একটা দানাও নেই। গরুগুলো যে কী খাবে! এতটুকু ঘাস পর্যন্ত নেই। সব জলের তলায়।

অন্য আর একজন বলল, আমরা জানি, মানুষ জনের জন্য আপনি প্রচুর করেন। তাই অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। যদি এই বিপদের দিনে আপনি একটু আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকান…

অমরেন্দ্রনাথ বললেন, এ ভাবে বলবেন না। আমার শুনতে খারাপ লাগে। আমি কে? সব তাঁর ইচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আপনাদের জমিদার কী করছেন?
— আর জমিদার… তার অবস্থা তো আমাদের চেয়েও শোচনীয়। শুনছি তো, কলকাতার বাগবাজারে তাদের যে সাতমহলা বাড়িটা আছে, সেটাও নাকি এ বার তারা বেচে দেবে।

— সাতমহলা বেচে দেবে! অমরেন্দ্রনাথ প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। সে কী! ওদের জমিদারি পড়ে গেছে বলে ওই রকম একটা সাতমহলা বাড়ি ওরা বিক্রি করে দেবে! শুনেছি, ওই বাড়িতে নাকি একটা সুড়ঙ্গ আছে। বাড়ির মেয়ে-বউরা সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে এক সময় নদীতে স্নান করতে যেত‌। কোন একটা মহলে নাকি ফাঁসিমঞ্চও আছে। আর ওই বাড়ির বাগানের মধ্যে বেলজিয়াম কাচের চোখ-ধাঁধানো যে নাচঘরটা আছে, সেখানে কে আসেনি? বেনারস থেকে পর্যন্ত বাঈজিরা আসত‌।

ওদের এক দাদু এক সময় নাতনির পোষা বেড়ালের বিয়ে দিয়েছিলেন সাড়ে চার লক্ষ টাকা খরচ করে। প্রতিটা নিমন্ত্রণপত্রের উপরে একটা করে হিরে বসানো ছিল। সারা শহর থেকে তো বটেই, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও নিমন্ত্রিতরা এসেছিলেন। মহাধুমধাম করে উৎসব চলছিল সাত দিন ধরে। ওই বাড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরেই ঝোলে বিদেশ থেকে আনা ইয়া বড় বড় ঝাড়লন্ঠন। খাওয়াদাওয়া হয় রুপোর থালায় সোনার চামুচে। উনি গড়গড় করে বলে যাচ্ছিলেন আর সুন্দরবন থেকে আসা ওই লোকগুলো হাঁ করে তা শুনছিল।

— ঠিক আছে, আমি দেখছি, কতটা কী করতে পারি।অমরেন্দ্রনাথ বলতেই অঞ্জনা বুঝতে পারল, উনি যখন একবার বলে ফেলেছেন, ‘ঠিক আছে, আমি দেখছি, কতটা কী করতে পারি’, ব্যস, তখন আর কিচ্ছু করার নেই। বৈঠকখানার দরজা থেকেই গটমট করতে করতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল অঞ্জনা। অমরেন্দ্রনাথ তা টেরও পেলেন না।
ওদের একটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে বললেন উনি।

আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করেই ডেকে পাঠালেন আদিত্যকে। তাকে বললেন, শুনলাম, বাগবাজারের সাতমহলাটা নাকি বিক্রি হবে। তুমি আজ থেকেই লেগে পড়ো। যে ভাবেই হোক, যত টাকা লাগে লাগুক, ওই বাড়িটা আমার চাই। ওটা শুধু একটা বাড়ি নয়, একটা ইতিহাস। একটা ঐতিহ্য।

এই প্রথম কোনও বাড়ির প্রতি এমন আগ্রহ দেখালেন অমরেন্দ্রনাথ। আদিত্যও উঠেপড়ে লাগল। উঠেপড়ে লাগল মানে সবটাই দেখানো। অমরেন্দ্রনাথ যাতে ভাবেন তাঁর আদিত্য ওই বাড়িটার জন্য সত্যিই খুব ছোটাছুটি করছে, সে জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে ও যখন তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত।

‘কোথায় যাচ্ছ?’ অমরেন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করলেই বলত, আপনি এই প্রথম মুখ ফুটে কোনও বাড়ির কথা নিজে থেকে বলেছেন, এটা আমাকে করতেই হবে। আসলে ওই বাড়িটা বিক্রি হবে, এই খবর রটে যাওয়ার পর শুধু কলকাতা নয়, ওই বাড়ির জন্য মুর্শিদাবাদ, বেনারস, লক্ষ্ণৌ, এমনকী দিল্লি থেকেও লোকেরা হামলে পড়েছে। কলকাতায় তিনমহলা, পাঁচমহলা প্রচুর আছে, কিন্তু সাতমহলা? ওই একটাই। তাই তো এত কাড়াকাড়ি। আমিও ছাড়ার পাত্র নই। আপনি চেয়েছেন বলে কথা, এমন দাম অফার করেছি, ওই দাম শুনলে ল্যাজ গুটিয়ে সবাই পালাবে।

— কত বলেছ?
টাকাটা বড় কথা নয় দাদা, বড় কথা হল প্রেস্টিজ। টাকা ছুড়ে আপনার নাকের ডগা থেকে কেউ আপনার পছন্দের জিনিস নিয়ে যাবে, তা এই প্রাণ থাকতে আমি হতে দেব না। এটা আপনি আমার ওপর ছেড়ে দিন। আমি যা করার করছি। এ নিয়ে আপনি একদম চিন্তা করবেন না।
অমরেন্দ্রনাথ আর মাথা গলাননি। যা করার আদিত্যই করেছে। করেছে মানে সুন্দরবনে গিয়ে ওই জমিদারকে একবার বলতেই নামমাত্র মূল্যে রাজি হয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু খাতা-কলমে সেই টাকার অঙ্কে কায়দা করে দুটো শূন্য বসিয়ে দেখানো হয়েছে একশো গুণ।

কতয় কেনা হয়েছে, সেটা বড় কথা নয়। শেষ পর্যন্ত ওই বাড়িটা যে নিজের নামে হয়েছে, তাতেই অমরেন্দ্রনাথ খুশি। এতটাই খুশি যে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। প্রথম দিনই ঘটা করে ওই বাড়িতে গিয়ে ঢুকলেন। আর ঢোকামাত্রই কেমন যেন হয়ে গেলেন তিনি। তাঁর রক্তে কী যেন একটা খেলে গেল। কী যেন লাফালাফি করতে লাগল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। উনি ঠিক করলেন, এ বার থেকে উনি এ বাড়িতেই থাকবেন। কিন্তু একটা বাড়ি থেকে সব কিছু টেনেটুনে আর একটা বাড়িতে নিয়ে আসা মানে হাজার হ্যাপা। তাই তিনি ঠিক করলেন, প্রথমে এমনিই কয়েকটা দিন ওখানে থাকবেন। সেই মতো দোতলার কোণের দিকের একটা ঘর ঝাড়পোছ করে বসবাসের উপযোগী করে তোলা হল।

উনি ও রকম একটা বিশাল বাড়িতে একা থাকবেন শুনে অঞ্জনা বায়না শুরু করল, ও-ও অমরেন্দ্রনাথের সঙ্গে যাবে। আদিত্য শুনে বলল, দাদা, ও যখন এত করে যেতে চাইছে, যাক না… আমি তো এ বাড়িতে আছি। আপনার কোনও চিন্তা নেই। লখাইকে আমিই দেখব।
অগত্যা অঞ্জনাকে নিয়ে উনি চলে গেলেন সাতমহলায়। সেখানে নতুন করে নিয়োগ করলেন কয়েক জন ঝি-চাকর।

বাড়িতে এক গাদা কাজের লোক থাকলেও লখাই কিন্তু একা। যখন ওর বাবা এ বাড়িতে থাকতেন তখন অনেক নিয়মকানুন ছিল। বাড়ির কোনও কাজের লোকের আত্মীয়-স্বজন এখানে আসতে পারত না। এলেও তাদের বাড়িতে ঢোকা বারণ ছিল। কথা বলার দরকার হলে বাড়ির মূল ফটকের বাইরে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হতো। কিন্তু নতুন বাড়িতে থাকতে শুরু করার পর থেকে দরকার না হলে অমরেন্দ্রনাথ আর এ বাড়িতে আসেন না। তাই এ বাড়ির নিয়মও শিথিল হয়েছে অনেকটা। যেমন রাঁধুনি মাসির ছেলে পেছনের গেট দিয়ে মাঝে মাঝেই তার মায়ের ঘরে আসে। দু’-চার দিন থেকেও যায়। কেউ দেখার নেই। বলারও নেই।

লখাই একদিন বিকেলবেলায় টমটম গাড়ি করে ঘুরতে যাওয়ার জন্য নীচে নেমে দেখে, তাকে দেখেই একটা ফুটফুটে মেয়ে তাদের গাড়ি বারান্দার নীচ দিয়ে দৌড়ে বাড়ির পেছন দিকে চলে গেল। কে মেয়েটা! ফুল ফুল জামা পরা! কাউকে জিজ্ঞেস করার আগেই সেখানে এসে হাজির হল কোচোয়ান। — কী গো, কী দেখছ ছোটবাবু? যাবে না?

লখাই গাড়িতে উঠে পড়ল। রাস্তার দু’দিকে দেখতে দেখতে ভুলেই গেল, বাড়িতে ফিরে ওই মেয়েটির কথা কাউকে জিজ্ঞেস করার কথা। এর ক’দিন পরে দোতলার খিড়কি দিয়ে দেখল, আর একটা মেয়ে সাজি নিয়ে তাদের বাগান থেকে ফুল তুলছে। কে মেয়েটা! আকাশি ফ্রক পরা! ও তড়িঘড়ি লোহার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে বাগানে গিয়ে দেখল, কেউ কোত্থাও নেই। ও এ দিক ও দিক তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।

হঠাৎ দেখে জুঁই ফুলের ওপরে একটা প্রজাপতি বসে আছে। খানিক বাদেই উড়ে গিয়ে আর একটা ফুলে বসল। তার পরে আর একটা… আর একটা… আর একটা… ফুলগুলোয় কী দারুণ গন্ধ! ও বাগানে ঢুকে বেশ কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে নিল। ফেরার সময় ননির মা তার হাতে ফুল দেখে বলল, তুমি বাগানে গেছলে ছোটবাবু? আমারে তো বলতি পারতে, আমিই নে এনি দিতাম।

— না গো, ফুলের জন্য আমি যাইনি। বাগানে গিয়ে দেখি ফুলগুলোর কী সুন্দর গন্ধ, তাই ছিঁড়ে নিলাম। দ্যাখো, কী সুন্দর গন্ধ… বলেই, ফুলগুলো তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— জানি, যুই ফুল তো! খুব সোন্দর গন্ধ। এই ফুলির গন্ধেই তো প্রজাপতি আসে। মৌমাছি আসে।
— তাই?
— শুধু পজাপতি বা মোমাছি কেন? তুমুও তো ওর গন্ধেই ওর কাছে গেছ, তাই না? তুমি যদি ওই রকম গন্ধ গায়ে মাখো, দেখবে, কতক লোক তুমার চারপাশেও ঘুরঘুর করবে।
— তাই নাকি?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু এই রকম গন্ধ কোথায় পাব? আমি কি সারা গায়ে ফুল ঘষব নাকি?
— তা কেন?
— তবে?
— তুমি সেন্টু মাখবে।
— সেন্ট? সেন্টে কি এই রকম গন্ধ হয় নাকি?
— কেন হবে না? এর রস দিয়েই তো হয়।
— তাই নাকি?
— হ্যাঁ, সেই সেন্টুতেও এই একই রকম গন্ধ।
— সত্যি?

ঘরে ঢুকেই ওর মনে পড়ে গেল বাগানে সাজি নিয়ে ফুল তুলতে থাকা ওই মেয়েটির কথা। কে ওই মেয়েটি! ও মনে মনে ঠিক করল, না, ওই মেয়েটাকে দেখলেও আমি আর কোনও দিন তার পেছনে ছুটব না। ও যাতে এমনিই আমার কাছে আসে তার ব্যবস্থা করব। আচ্ছা, এই ফুলের গন্ধের জন্যই তো প্রজাপতি ছুটে আসে, তাই না? তাই যদি হয়, তা হলে তো এই গন্ধে মানুষেরও ছুটে আসার কথা। আমি যদি এই গন্ধটা মাখি, তা হলে কি ওই মেয়েটা গন্ধ শুঁকে শুঁকে আমার কাছে চলে আসবে! আসতে পারে!

ওর বাবা সাতমহলাতেই থাকেন। মাঝে মাঝে আসেন। সে দিন যখন এলেন, ও স্কুলে যাচ্ছে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। তবুও বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল লাখাই। — বাবা, আমাকে একটা সেন্ট এনে দিয়ো তো।

— সেন্ট? কী করবি?
— মাখব‌
— ঠিক আছে, ম্যানেজারবাবুকে বলে দিস, এনে দেবে।
— না, তুমি এনে দেবে।
— আমি? ঠিক আছে, এনে দেব।
— কী রকম বন্ধু বলো তো? জানতে চাইল লখাই।
— কী রকম?
— একেবারে জুঁই ফুলের মতো।
— জুঁই ফুলের মতো? ঠিক আছে, কালকেই এনে দেব।
— এনো কিন্তু মনে করে, কেমন?
— ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে।
গাড়িবারান্দার নীচ থেকে ফিটনগাড়িতে উঠে পড়ল লাখাই।

এত সকালে সাধারণত লখাই ওঠে না। কিন্তু আজ উঠেছে। বাবা নেই দেখে যার যা খুশি করছে। বাগানের সব ক’টা ফুল সে দিন কে যেন নিয়ে গিয়েছিল! আজ যখন ঘুম ভেঙে গেছে, যাই তো, গিয়ে দেখে আসি কে ফুল নেয়… দোতলার খিড়কি থেকে দেখে, তাদের বাগানে ঢুকে একটা মেয়ে সাজি করে ফুল তুলছে। এই মেয়েটা আবার কে! সে দিনও একটা দেখেছিলাম ! তার আগের দিনও একটা!

লোহার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে ও নেমে এল নীচে। বাগানের দিকে যেতেই মেয়েটা এক দৌড়ে পালিয়ে গেল। ও তার পিছু নিতে যাচ্ছিল, দেখল, সামনেই বুকুপিসি। ও বুকুপিসিকে বলল, তুমি কি এক্ষুনি একটা মেয়েকে এখান দিয়ে দৌড়ে যেতে দেখেছ গো?
বুক বলল, হ্যাঁ। অবাক হল লখাই। তুমি তাকে ধরলে না! ও তো সব ক’টা ফুল ছিঁড়ে নিয়ে গেল। চলো, দেখবে চলো, বাগানে বুঝি আর একটাও ফুল নেই।

— না না, সব ফুল নেয়নি। ওই পুজোর জন্য কয়েকটা তুলেছে। আজ বৃহস্পতিবার না?
— পুজোর জন্য! তার মানে তুমি সব জানো!
— হ্যাঁ, জানব না?
— মেয়েটা কে?
— তুমি চিনতে পারোনি ছোটবাবু?
— না তো, কে?
— ও তো আমার মেয়ে।
— তোমার মেয়ে?


— হ্যাঁ, ও তো এখন মামার বাড়ি থাকে। গরমের ছুটি। তাই আমার কাছে এসেছে। ওকে বলেছিলাম, ও দিকটা যাস না। বড়বাবু জানতে পারলে রাগারাগি করবে। ফুল তুলতে হলে এ দিক থেকে তুলবি। কিন্তু ও তো অত বোঝে না। বাচ্চা মেয়ে। তাই বোধহয় ভুল করে এ দিকে চলে এসেছিল।


— তাই?
— আমিই তো ওকে ফুল তুলতে পাঠিয়েছিলাম। ও দিকে বোধহয় বেশি ফোটেনি। তাই খুঁজতে খুঁজতে এ দিকে চলে এসেছে। আমি ওকে বারণ করে দেব। তোমাকে দেখে বোধহয় ও ভয় পেয়েছে। তাই ছুটে পালিয়ে গেল।
— আমাকে দেখে ভয় পেয়েছে!
— তুমি তো এত সকালে ওঠো না। হঠাৎ এত সকালে?
— না, এমনিই। ঘুম ভেঙে গেল তো, তাই। কিন্তু এই মেয়েটা ছাড়াও, আমি এই রকম আরও দুটো মেয়েকে দেখেছি এ দিকে আসতে।
— না গো ছোটবাবু, এই বাড়িতে তো এই রকম আর কোনও মেয়ে নেই। তুমি ওকেই দেখেছ।
— না না, ফুল ফুল জামা পরা…
— ফুল ফুল জামা? ওটা তো ওরই।
— আর একটা মেয়ে, আকাশি রঙের ফ্রক পরা…
— আকাশি ফ্রকটাও তো ওর। ওর বড়মামা দিয়েছে।

নমো’ উপন্যাসের ১ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন
নমো’ উপন্যাসের ২য় পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন
নমো’ উপন্যাসের ৩য় পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

__সিদ্ধার্থ সিংহ
কবি, ছড়াকার, প্রবন্ধকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক।
কলকাতা, ভারত।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *